বিশেষ প্রতিবেদক, বরিশাল:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অপরাধীদের তোষণ এবং উদ্ধারকৃত চোরাই মালামাল বিক্রির মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) আমানতগঞ্জ ফাঁড়ির দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাকেরগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ প্রজেক্টের চুরি যাওয়া বৈদ্যুতিক তামার তার ও লোহা উদ্ধার করে উৎকোচের বিনিময়ে অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধারকৃত মালামাল স্থানীয় এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করে দেওয়ারও অভিযোগ তুলেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য হলেন—বিএমপির আমানতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোঃ কবির হোসেন (বিপি-৮৭০৭১০৯৭ ৩৩) এবং সহকারী টাউন দারোগা (এটিএসআই) মোঃ জাকির হোসেন (বিপি-৮৩০২০৮৩৯৮৩)।
ঘটনাক্রম ও রফা-দফার বিবরণ:
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৬ জুন (শুক্রবার) বেলা আনুমানিক ৩:৩৫ ঘটিকায় বাকেরগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ ‘হ্যাভেন কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট’ থেকে চুরি হওয়া মালামাল নিয়ে দুই ব্যক্তি একটি মোটরচালিত ভ্যানযোগে নগরীর হাটখোলা মরিচপট্টি এলাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী মোঃ আবুল শিকদারের গোডাউনে আসে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এএসআই কবির হোসেন ও এটিএসআই জাকির হোসেন সেখানে অভিযান চালিয়ে চোরচক্রের দুই সদস্যসহ ভ্যানটি আটক করেন। ভ্যানটিতে তিনটি সিমেন্টের বস্তা ও দুটি কার্টনে সংরক্ষিত প্রায় ১৮৫ কেজি মূল্যবান তামার তার এবং ৫০ কেজি লোহার গর্দা ছিল।
তবে অভিযুক্তদের থানায় বা ফাঁড়িতে হস্তান্তর এবং কোনো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, স্থানীয় ওই ভাঙারি দোকানের সামনে ভ্যানটি রেখে দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে চলে দরকষাকছি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দীর্ঘ রফা-দফা শেষে প্রতি কেজি তামার তার ১,৬১০ টাকা দরে (১৮৫ কেজি = ২,৯৭,৮৫০ টাকা) এবং লোহার গর্দা ৪৫ টাকা দরে (৫০ কেজি = ২,২৫০ টাকা) হিসাব করে সর্বমোট ৩,০০,১০০ (তিন লাখ একশত) টাকায় উক্ত মালামাল স্থানীয় ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী আবুল শিকদারের কাছে বিক্রি করা হয়। অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর আটককৃত দুই অভিযুক্তকে কোনো প্রকার আইনি পদক্ষেপ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়।
সমঝোতার সময় ঘটনাস্থলে হাটখোলা লেবার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দিলু পাইক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মোঃ রিয়াজুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিক উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ:
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ভাঙারি ব্যবসায়ী আবুল শিকদার তামা কেনার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তিনি ৫০ কেজি লোহার গর্দা কেনার কথা স্বীকার করে বলেন, “মালামাল বিক্রি করার সময় আমানতগঞ্জ ফাঁড়ির এএসআই কবির এবং এটিএসআই জাকির দুজনই উপস্থিত ছিলেন। পরে তারা টাকা নিয়ে কী করেছেন, তা আমার জানা নেই।” সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য তিনি প্রতিবেদকের কাছে অনুরোধ জানান।
রূপাতলীর ভাঙারি ব্যবসায়ী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “আবুল শিকদার সাধারণত এসব মালামাল কেনাবেচা করেন। ওই দিনের মালামাল লাভজনক হওয়ায় কম দামে তিনি ১৮৫ কেজি তামা ও ৫০ কেজি লোহার গর্দা কিনে নেন।” তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, “এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা সিভিল পোশাকে মোটরসাইকেলে ঘুরে এসব চোরাই মালের সন্ধানে থাকেন। মালামাল উদ্ধার করে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে টাকার বিনিময়ে রফা-দফা করাই তাদের কাজ।”
একই বিষয়ে হাটখোলার মরিচপট্টির ব্যবসায়ী হেমায়েত হোসেন জানান, ওই দিন চোরাই মালামাল নিয়ে পুলিশ নাটকের সৃষ্টি করে। পরে মালামাল আবুল শিকদার কিনে নেন বলে তিনি নিশ্চিত হন।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাঁড়ির ইনচার্জ (এসআই) কুদ্দুস দায় এড়িয়ে বলেন, “মালামাল জব্দ করার পর যাদের মালামাল তারা নিয়ে গেছে। তবে পরবর্তীতে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।”
এদিকে তথ্য অনুসন্ধানের সময় এএসআই জাকিরের পক্ষে ব্যবসায়ী পরিচয়ে এক ব্যক্তি পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদককে ফোন করে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য অনৈতিক অনুরোধ জানান। খোঁজ নিয়ে যানা গেছে ঐ ব্যক্তি আসলে কোন ব্যবসায়ী না, তিনি বরিশালের স্থানীয় সাংবাদিক। অন্যদিকে অভিযুক্ত এএসআই কবির এবং এটিএসআই জাকিরকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা সাংবাদিক পরিচয় জানার পরপরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে তাদের মন্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

পুনরাবৃত্তিমূলক অপরাধ ও বাহিনীর ভাবমূর্তি:
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ জাতীয় অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস এটিই প্রথম নয়। এর আগে গত ২৯ মার্চ একই প্রক্রিয়ায় ৮০ কেজি চোরাই তামার তারসহ এক অপরাধীকে আটক করার পর, দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে মালামাল বিক্রি করে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া স্থানীয়দের দাবি, এলাকাটির চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সাথেও তাদের অনৈতিক যোগসাজশ রয়েছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতো দায়িত্বশীল পেশায় থেকে গুটি কয়েকজন সদস্যের এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকেরা।


















