নুরুল আমিন, সীমান্ত প্রতিনিধি:মাটির নিচে রয়েছে গুপ্তধন, আর সেই গুপ্তধন তুলতে প্রয়োজন বিশেষ তন্ত্র-মন্ত্র। ঘরের নির্দিষ্ট একটি কক্ষে কালো কাপড় টানিয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে চলে গুপ্তধন উদ্ধারের এক অভিনব ও ভয়ানক কৌশল। এরপর বলা হয়, এখনই দিতে হবে আরও কিছু নগদ অর্থ; তা না হলে গুপ্তধন আবার মাটির নিচে ঢুকে যাবে আপনা-আপনি। আর এভাবেই টাকা দিয়ে প্রতারক চক্রের এই ফাঁদে আটকা পড়ছে বহু পরিবার।
কক্সবাজারের ঈদগাঁও কেন্দ্রিক একটি চক্রের বিরুদ্ধে এমন অভিনব কৌশলে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ঈদগাঁওয়ের শামসুল আলম (৩৫), মনোয়ারা বেগম (৪৫) এবং মনোয়ারা বেগমের ছেলে মোহাম্মদ নুর প্রকাশ মো. এহসান শান্ত। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, অডিও-ভিডিও রেকর্ড এবং মোবাইল আর্থিক লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, একই কৌশলে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের অন্তত দুই পরিবারের কাছ থেকে কয়েক মাসে বিপুল অর্থ নেওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। শুধু একটি পরিবারের কাছ থেকেই গত তিন মাসে প্রায় ২৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। উখিয়া-টেকনাফের পালংখালী ও থাইংখালীর আরও দুই পরিবারের কাছ থেকে একই পদ্ধতিতে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ এই চক্রের ফাঁদে পড়েন টেকনাফের শামলাপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমের মেয়ে ও নুরুল আবছারের স্ত্রী সাবেকুন্নাহার। স্থানীয় একটি সূত্রের মাধ্যমে চক্রটি তাঁর পরিবারের সন্ধান পায় বলে জানা যায়। এরপর শুরু হয় কথিত গুপ্তধন উত্তোলনের নামে প্রতারণার কৌশলে সাবেকুন্নাহার ও তাঁর পরিবারকে আটকানোর প্রক্রিয়া। জানা যায়, শামসুল আলম নিজেকে কবিরাজি বিদ্যায় পারদর্শী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে কয়েক দফায় সাবেকুন্নাহারের বাড়িতে যান। তিনি দাবি করেন, বাড়ির আঙিনার মাটির নিচে গুপ্তধন রয়েছে এবং বিশেষ পদ্ধতিতে সেটি তুলে দেওয়া সম্ভব। এই জন্য বিভিন্ন শর্তের কথা বলে পর্যায়ক্রমে টাকা নেওয়া শুরু করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি ও প্রমাণাদি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েক দফায় নগদ মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পর গত ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর শামসুল আলমের ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে আরও ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। এরপর আরও ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। তবে এবার পরিবারটি শর্ত দেয়, গুপ্তধন হাতে পাওয়ার পরই বাকি টাকা দেওয়া হবে। অভিযোগ অনুযায়ী, শামশুল আলম এতে রাজি হলেও বিষয়টি পরিবারের নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে জানাতে নিষেধ করেন। গত শনিবার (৫ই সেপ্টেম্বর) দিনে শামশুল আলম সাবেকুন্নাহারের বাড়িতে আসার কথা থাকলেও সে দিনে না এসে রাতে সবার আড়ালে সাবেকুন্নাহারের বাড়িতে আসেন এবং তাঁর সহযোগী হিসেবে ছিলেন মনোয়ারা বেগম।
প্রতারক চক্রটির কৌশল অনুযায়ী, বাড়ির একটি নির্দিষ্ট কক্ষের চারপাশ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর মোমবাতি জ্বালিয়ে শুরু হয় কথিত গুপ্তধন উদ্ধারের কার্যক্রম। একপর্যায়ে সাবেকুন্নাহারকে বলা হয়, মাটির নিচ থেকে গুপ্তধন ওপরে উঠছে; এখনই বাকি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রস্তুত করতে হবে। কিন্তু ওই সময় ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে টাকা না থাকায় তাঁরা স্থানীয় এক সচেতন যুবকের কাছে টাকা ধার চান। পুরো ঘটনাটি শুনে ওই যুবকের সন্দেহ হয় এবং তিনি শর্ত দেন, আগে গুপ্তধন বের করে দেখাতে হবে, তারপর টাকা দেওয়া হবে। এতেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
জানা যায়, বাইরের কাউকে গুপ্তধন দেখানো যাবে না জানিয়ে শামসুল আলম আপত্তি করেন। তাঁর দাবি ছিল, অন্য কেউ দেখলে গুপ্তধন আবার আপনা-আপনি মাটির নিচে চলে যাবে। তাঁর এই বক্তব্যে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। পরে ওই যুবক সরাসরি সাবেকুন্নাহারের বাড়িতে গিয়ে কালো কাপড়ে মোড়ানো কক্ষে প্রবেশ করেন এবং শামশুল আলম ও মনোয়ারা বেগমকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে থাকা একটি ভিডিওর বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, সেখানে শামশুল আলম ও মনোয়ারা বেগম কথিত গুপ্তধন উদ্ধারের পুরো প্রক্রিয়াটি তাঁদের পাতানো ফাঁদ বলে স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি দিচ্ছেন।

পরিবারটির দাবি, ভিডিওতে তাঁরা স্বীকার করেন যে যেসব চামচ, মূর্তি বা ধাতব বস্তু গুপ্তধনের নিদর্শন হিসেবে দেখানো হয়েছিল, সেগুলো বাইরে থেকে সংগ্রহ বা তৈরি করে আনা হয়েছিল। যে বাড়িতে ফাঁদ পাতা হতো, সেই বাড়ির নির্দিষ্ট কক্ষে আগে থেকে গর্ত করে এসব বস্তু মাটির নিচে রাখা হতো বলে তাঁরা জানান। ঘটনার পর ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন বিকাশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিগত নম্বরের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
সাবেকুন্নাহারের ঘটনার সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে একই ধরনের আরেকটি অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। টেকনাফের শামলাপুরের বাসিন্দা নুর আহমদের ছেলে সাইফুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের কাছ থেকেও একই কৌশলে গত প্রায় তিন মাসে প্রায় ২৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে থাকা বিকাশ ও ব্যাংক লেনদেনের নথিতে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সূত্র মতে, সাবেকুন্নাহারের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সাইফুল ইসলামের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করে পুরোনো “গুপ্তধন” গল্পটি আবার সামনে আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এবার পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সাইফুল ইসলামের পরিবার জানায়, তখন তাঁদের থানায় বা পুলিশের কাছে না যাওয়ার জন্য বলা হয়, এমনকি নেওয়া অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হয়।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি এসেছে শামসুল আলমের নামে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত বিকাশ অ্যাকাউন্টের লেনদেন বিশ্লেষণ থেকে। গত পাঁচ থেকে ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বেশি অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে শামলাপুর বাজারের বিভিন্ন বিকাশ এজেন্টের দোকান থেকে শামশুল আলমের ব্যক্তিগত বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর সত্যতা মিলেছে। অনুসন্ধানে উখিয়া-টেকনাফের পালংখালী ও থাইংখালী এলাকার আরও দুটি পরিবারের কাছ থেকে একই পদ্ধতিতে আনুমানিক ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ নথি ও লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। অভিযোগগুলো ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতারণা নয়; বরং নির্দিষ্ট এলাকায় পরিকল্পিতভাবে গুপ্তধনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, ভয় ও লোভকে কাজে লাগানো একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো র্যাব-১৫-এর সিপিসি-২ (হোয়াইক্যং ক্যাম্প) কর্তৃক শামসুল আলম ও মনোয়ারা বেগমকে উদ্ধার দেখিয়ে দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তি। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ৮ সেপ্টেম্বর রাতে র্যাব-১৫-এর পক্ষ থেকে অপহরণবিরোধী বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে—এমন বক্তব্য দিয়ে প্রেস রিলিজ দেওয়া হয়। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের কাছে থাকা ভিডিও, আর্থিক লেনদেনের তথ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণ র্যাবের একজন গুরুত্বপূর্ণ সোর্সের মাধ্যমে র্যাবের সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে উপস্থাপন করা হলেও, ঘটনার মূল অভিযোগ নিয়ে যথাযথ তদন্তের পরিবর্তে বিষয়টি অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
পরিবারটির আরও দাবি, টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে র্যাবের এক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ও সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছে। এ বিষয়ে শহীদ হাসান শ্যামল নামের এক র্যাব কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের কথাও জানিয়েছে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী পরিবার।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, চক্রটির সদস্যরা কোনোভাবে বিপাকে পড়লে র্যাব-১৫-এর কিছু সদস্যের সহযোগিতায় তারা পার পেয়ে যায়। এমনকি অপহরণবিরোধী অভিযানকে ব্যবহার করে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার অভিযোগও করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। তবে এ অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং স্বাধীন তদন্ত ছাড়া এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না। কোনো ব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র জানতে র্যাবের অভিযানসংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া তথ্য—সবগুলোই পাশাপাশি যাচাই করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভুক্তভোগী কে এবং অভিযুক্ত কে তা নির্ধারণে কেবল একটি পক্ষের বক্তব্য নয়; অর্থের গতিপথ, ডিজিটাল যোগাযোগ, ভিডিও-অডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করা। সত্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। কারণ মাটির নিচে সত্যিই কোনো গুপ্তধন ছিল কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন— মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে মাটির ওপরেই কি তৈরি হয়েছিল কোটি টাকার প্রতারণার সাম্রাজ্য?


















