নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, যেই লাউ সেই কদু। সেটাই আবার দেখা গেলো রাজধানীতে ফুটপাত ও সড়ক থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযানে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ঘটা করে দখলদারদের উচ্ছেদ করলেও আবারও অবৈধ দোকানপাট বসানো হয়েছে। এতে রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে। চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
চলতি মাসের প্রথমদিন থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জোনভিত্তিক সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে ডিএমপি। এই অভিযানে ফুটপাত দখলকারীদের উচ্ছেদ ও জরিমানাও আদায় করা হয়।
গত ১ এপ্রিল সকাল ১০টা। রাজধানীতে আঁটঘাট বেঁধে মাঠে নামেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। উদ্দেশ্য নগরের ফুটপাত থেকে অবৈধ দখলদারদের সরিয়ে জনগণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা। এরপর সীমানা নির্ধারণ করে শুরু হয় অভিযান। অভিযান চালানো হয় ফার্মগেট এলাকার ইন্দিরা রোড, গ্রিনরোড, আনন্দ সিনেমা হল, পান্থপথ ও কারওয়ান বাজার এলাকায়।
প্রথমদিনের অভিযানে সতর্ক করে অবৈধ দখলমুক্ত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয় দখলদারদের। একই সঙ্গে নির্ধারিত দোকানের সামনে অবৈধভাবে অতিরিক্ত জায়গা দখলের অংশ ভেঙে দেওয়া হয়। বাকিদের সতর্ক করে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে অভিযান শেষ করা হলেও সেই অভিযানের সুফল মেলেনি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন সতর্কতার পরও কোনো ধরনের কর্ণপাত নেই দখলদারদের। আর নির্দেশনার পর নেই তদারকিও।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টা। রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড। সড়ক আর ফুটপাতজুড়ে সারি সারি দোকান। নানান পণ্যের সমাহারে সেজেছে রং-বেরঙের দোকান। কী নেই সেখানে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে সবই আছে। আর চলার পথে এসব দোকানে ভিড় জমান ফুটপাত ধরে হেঁটে চলা পথচারীরা। ফলে যানবাহনসহ সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের মতো এদিন সকাল থেকেই ব্যবসায়ীরা এসে দোকান খুলে বসেছেন। ক্রেতাদের আনাগোনাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে পথচারীদের চলাচলে বেশ খানিকটা বাধাগ্রস্ত হতে দেখা গেছে সাধারণ মানুষকে।
কারওয়ান বাজার ও বসুন্ধরা শপিংমল এলাকায়ও ফুটপাতে ব্যবসায়ীদের দোকান সাজিয়ে বসতে দেখা গেছে। তবে এই এলাকায় মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় ফুটপাত ধরে হেঁটে চলাচলে ভোগান্তির চিত্র খুব একটা চোখে পড়েনি।
ফুটপাতে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযানের পর আবারও বসেছে, এ বিষয়ে কথা হয় তেজগাঁও বিভাগের ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া তেজগাঁও ট্রাফিক জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) অনীশ কীর্ত্তনীয়া। তিনি বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযানটি সেন্ট্রালি চালানো হয়েছে। আমরা আবার মাঠের তথ্য সংগ্রহ করছি। আপনি রেগুলার মনিটরিং করলে দেখবেন আমরা প্রতিদিন সকালবেলা হ্যান্ড মাইক দিয়ে মাইকিং করছি যাদের উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তারা যেন আর না বসে।’
তিনি বলেন, ‘যারা আবার বসছে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে যে কাদের সহযোগিতায় তারা আবার বসছে বা বসার চেষ্টা করছে। আমাদের পক্ষ থেকে আবারও অভিযান চালানো হবে। কমিশনার স্যার নির্দেশনা দিলে আমরা আবারও মাঠে নামবো।’
আগারগাঁও এলাকার পাসপোর্ট অফিস, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরের সামনের সড়কে গত ৫ এপ্রিল উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
গত ৭ এপ্রিল পাসপোর্ট অফিসের সামনের সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই পাসপোর্ট অফিসের প্রধান ফটকের সামনের সড়কের বিপরীত পাশের ফুটপাত দখল করে বসেছে একাধিক চায়ের দোকান। এসব ফুটপাত ব্যবহার করে হেঁটে চলার কোনো উপায় নেই। এছাড়া সড়কের দুই পাশ ধরে রাখা একের পর এক সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি। ফলে সংকুচিত হয়েছে সড়ক, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে যান চলাচল।
এই এলাকার দোকানিরা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন এখানে উচ্ছেদ অভিযানে এসেছিল। এসে সবাইকে এখান থেকে চলে যেতে বলেছে। উচ্ছেদ করেনি, সতর্ক করে গেছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামনে ও পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সীমানা প্রাচীরের গা ঘেঁষে বসেছে হোটেল, চায়ের দোকান, মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্ন দোকান। এছাড়া একই স্থানে প্রধান সড়কের ওপরে ভ্যানে করে পোশাক বিক্রি করতেও দেখা গেছে। এছাড়া ইএনটি অ্যান্ড হেড নেক ক্যানসার হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটসহ এই এলাকায় চালানো অভিযানের স্থানগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
ফুটপাতের ব্যবসায়ী স্বপন মিয়া বলেন, ‘সরকার আমাদের বসার জন্য একটা ব্যবস্থা না করে দিয়ে এভাবে উচ্ছেদ অভিযান করছে। আমরা কোথায় যাবো? আমাদের দিকটাও তো সরকারকে দেখতে হবে।’
শেরে বাংলা নগর ট্রাফিক জোনের এসি রাকিব হাসান বলেন, ‘আমরা সকাল-বিকেল এ বিষয়ে ফলোআপ করছি। আমরা গিয়ে যদি কাউকে নতুন করে বসতে দেখছি তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের তুলে দিচ্ছি। থানার মোবাইল টিমের সঙ্গে আমাদের ট্রাফিক বিভাগ সমন্বয় করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি। আমরা যাদের সরিয়ে দিচ্ছি তারা যাতে নতুন করে আবার না বসতে পারে সেই বিষয়গুলো নিশ্চিত করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যেহেতু তথ্য দিয়েছেন আমি এখনই টিম পাঠাচ্ছি। এরা তো সুযোগসন্ধানী। দেখা যাচ্ছে সকালে উচ্ছেদ করছি আবার আমরা চলে এলেই বসছে। তবে আমাদের দিক থেকে ফুটপাতে অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স।’
এসব বিষয়ে জানতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

















