নিজস্ব প্রতিবেদক :
মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মাত্র তিন বছরে দারিদ্র্য আবার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে। ২০২৫ সালেই নতুন করে দরিদ্র হয়েছে দেশের ১৪ লাখ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আগে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকলেও তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ লাখে।
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংস্থাটির নিজস্ব কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, টানা তিন বছর ধরে মন্থর প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি, চাপের মুখে থাকা ব্যাংকিং খাত, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং মন্থর বেসরকারি বিনিয়োগের মতো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত প্রতিকূলতার কারণে আরও জটিল হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশে ২০২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে অবস্থান করছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তব আয় কমে গেছে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আগে চলতি বছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল, কিন্তু সংঘাতের কারণে এখন মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।
বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বেড়ে রাজস্ব সক্ষমতা সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ আমদানি ব্যয়, দুর্বল রপ্তানি প্রবণতা এবং রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় চলতি হিসাবের ওপর চাপ বাড়বে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী।
তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত হতে পারে।
সংস্থাটি বলছে, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নত করা।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের পরিচালক জঁ পেম বলেন, স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি। কিন্তু রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে সুদূরপ্রসারী কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই স্থিতিশীলতা স্থায়ী হতে পারে না। আর এই স্থিতিশীলতা অর্জনে রাজস্ব, আর্থিক খাত ও ব্যবসায়িক পরিবেশে গভীর সংস্কার জরুরি।


















