আলমগীর হোসেন : দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় অগ্রযাত্রার যে চোখধাঁধানো চিত্র সরকারি নথিপত্রে দৃশ্যমান, তার ঠিক বিপরীত ও এক নির্মম বাস্তবতার দাপ্তরিক দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার একটি সড়ক। দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে অবহেলা ও চরম প্রশাসনিক উদাসীনতার শিকার ২ নম্বর মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের ‘আরএইচডি গোলদার বাড়ি ভায়া মানসুরাবাদ দাখিল মাদ্রাসা হয়ে রাজ্জাক মোল্লাবাড়ি সড়ক’ (সড়ক আইডি: ৫৭৮৭৬৪০০৩)। বছরের পর বছর পার হলেও ইটের সলিংয়ের এই সড়কটির কপালে জোটেনি আধুনিকায়নের ছোঁয়া।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে বারবার, ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাবশালী প্রতিনিধিরা; কিন্তু ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জনগুরুত্বপূর্ণ পথটির ভাগ্যোন্নয়ন ঘটেনি। এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে জন্য পটুয়াখালী জেলা সদর ও মির্জাগঞ্জ হয়ে বরিশাল কিংবা রাজধানী ঢাকাগামী যাত্রীদের অন্যতম এই সংযোগ পথটি এখন স্থানীয় জনসাধারণের কাছে এক আতঙ্কের নাম—একটি উন্মুক্ত ‘মরণফাঁদ’।
অবহেলার আড়াই দশক ও রাজনৈতিক ঔদাসীন্য
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মির্জাগঞ্জ মহাসড়ক থেকে মানসুরাবাদ মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার অংশটি ওই অঞ্চলের অগণিত মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ধমনী। প্রায় দুই দশক আগে সাময়িক স্বস্তির লক্ষ্যে ইট বিছানো হলেও, এরপর আর কোনো আধুনিক সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি এখানে। বিগত ১৫ বছরের টানা আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল, কোন জনপ্রতিনিধির নজরে আসেনায় এই সড়কটি। তার পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের শাসনামলে—কাউকেই এই সড়কটির স্থায়ী টেকসই সমাধানে জোরালো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। এমনকি তৎকালীন সময়ে এ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো প্রভাবশালী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে মির্জাগঞ্জ উপজেলায় নজীর বিহীন উন্নয়ন করেছে, কিন্ত ২ নং মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের এই সড়কটির প্রতি কোন নেতা নেত্রীর অবকাঠামোগত সংকট দূরীকরণে কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় চরম ঝুঁকি
সড়কটি সরজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, অধিকাংশ জায়গার ইট উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল বিশাল খানাখন্দ। এই চরম বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়েই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সিনিয়র মাদ্রাসা ও মহাবিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। এছাড়া মির্জাগঞ্জ ও সুবিদখালী হাট-বাজারকে কেন্দ্র করে আশপাশের ৫-৬টি গ্রামের শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াত নির্ভর করে এই একটি মাত্র পথের ওপর।
সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থী ও প্রসূতি নারীদের। জরাজীর্ণ ও কঙ্কালসার এই সড়কের দরুন জরুরি মুহূর্তে মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত জেলা বা উপজেলা হাসপাতালে পৌঁছানো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে প্রতিনিয়ত চরম স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছেন এই প্রান্তিক জনপদের মানুষ।
চালক ও ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় যানবাহন চালকেরা জানান, “আমরা কতটা মানবেতর অবস্থার মধ্য দিয়ে গাড়ি চালাই, তা এই রাস্তায় না নামলে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। প্রধান সড়কে ওঠার আগেই যানবাহনের যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে পড়ে, অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। যানবাহন চালানো তো দূরের কথা, সাধারণ পথচারীদের পায়ে হেঁটে চলার পরিবেশও আর অবশিষ্ট নেই।”
স্থায়ী সমাধানের আকুল আবেদন
স্মার্ট বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোতে যখন যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, তখন পটুয়াখালী জেলা সদরের সন্নিকটে অবস্থিত এই সড়কটির এমন জরাজীর্ণ ও সখ্যতাহীন অবস্থা স্থানীয়দের মনে তীব্র আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। অবহেলিত মানসুরাবাদ তথা মির্জাগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে সড়কটি অনতিবিলম্বে আধুনিক মানে উন্নীত করতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ


















