নিজস্ব প্রতিবেদক :
তিস্তা নদী যেখানে তার পলিমাটি আর ভাঙনের গল্প লেখে, সেই মহীপুর ঘাটে আগামীকাল ২৩ জানুয়ারি এক নতুন ইতিহাসের পাণ্ডুলিপি লেখা হতে যাচ্ছে। নদীর চরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সাথে এবার মিশে যাবে কবিতার পঙ্ক্তিমালা আর লিটলম্যাগ বা ছোটকাগজ কর্মীদের গভীর আড্ডা। ‘ফিরেদেখা’ সংগঠনের হাত ধরে আয়োজিত হতে যাচ্ছে এক দিনব্যাপী সাহিত্যের উৎসব— ‘তিস্তাপারে কবিতা–লিটলম্যাগ আড্ডা’।
গল্পের শুরুটা হয়েছিল কবি সাকিল মাসুদের হাত ধরে। তিনি যখন দেখেন এই জনপদের মানুষের না-বলা কথাগুলো মূলধারার সাহিত্যে খুব একটা জায়গা পায় না, তখন থেকেই তাঁর মনে এক ধরণের হাহাকার জন্ম নেয়। সেই হাহাকার থেকেই জন্ম নিয়েছে এই আয়োজন। সাকিল মাসুদের মতে, উত্তরাঞ্চলের ছোটকাগজ আন্দোলন এবং তিস্তাপারের জীবনসংগ্রামকে দৃশ্যমান করতে না পারলে আমাদের সাহিত্য পূর্ণতা পাবে না। তাই তাঁর এই স্বাগত আহ্বানে সাড়া দিয়ে মহীপুর ঘাটে আসছেন দেশের একঝাঁক গুণী মানুষ।
শুক্রবার সকাল ৯টায় যখন নদীর বুকে রূপালি রোদের ঝিলিক পড়বে, তখন অনুষ্ঠানের পর্দা তুলবেন কবি ও প্রাবন্ধিক আব্দুর রাজ্জাক। তাঁর চোখেমুখের দীপ্তি আর উদ্বোধনী ভাষণে ফুটে উঠবে উত্তরাঞ্চলের সাহিত্যের দীর্ঘ পরম্পরা। প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আব্দুর রহিম, যিনি এই অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের স্বরকে বারবার তুলে এনেছেন। পুরো আড্ডাটি সাজিয়েছেন কবি ও ফিরেদেখার আহ্বায়ক কাইয়ুম খান, যাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে ফুটে উঠবে এই মিলনমেলার নেপথ্য পরিশ্রমের গল্প।
উত্তরের হিমেল বাতাসের মাঝে কবি সৈকত হাবিব শোনাবেন বাংলাদেশে ছোটকাগজ চর্চার চড়াই-উতরাইয়ের কাহিনী। কীভাবে একটি ছোটকাগজ একটি বড় বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে, সেই মন্ত্রই তিনি তুলে ধরবেন ‘বাংলাদেশে ছোটকাগজ চর্চা ও উত্তরাঞ্চলের অবদান’ শীর্ষক আলোচনায়। বেলা ১১টায় নদীর কিনারে বসে যখন কবিরা তাঁদের স্বরচিত কবিতা পাঠ শুরু করবেন, তখন হয়তো তিস্তার জলও থমকে দাঁড়াবে সেই সুর শুনতে।
দুপুর গড়িয়ে যখন ১২টা বাজবে, তখন শুরু হবে আড্ডার সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশ— ‘তিস্তাপারের মানুষ ও জীবন’। কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক রানা মাসুদ প্রধান আলোচক হিসেবে তুলে ধরবেন নদীর পাড়ের মানুষের সংস্কৃতি আর টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প। তাঁর সেই গল্পের সাথে সুর মেলাবেন তীক্ষ্ণদৃষ্টির গবেষক ও সাংবাদিক ড. অখিল পোদ্দার এবং কবি ও শিক্ষক মারুফ হোসেন মাহবুব। এই আলোচনা কেবল তত্ত্বের কথা হবে না, বরং হয়ে উঠবে তিস্তাপারের মানুষের হৃদস্পন্দনের প্রতিধ্বনি।
ফিরেদেখার সভাপতি কবি তাপস মাহমুদের সভাপতিত্বে এই পুরো আয়োজনটি যেন এক সুরের সুতোয় বাঁধা। সাকিল মাসুদ বিশ্বাস করেন, এই আড্ডা থেকে যে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হবে, তা নতুন প্রজন্মের মনে সাহিত্যের এক মশাল জ্বেলে দেবে। বিকেল সাড়ে তিনটায় যখন সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়বে, তখন মহীপুর ঘাটের ধুলোবালি মেখে সাহিত্যিকরা বিদায় নেবেন ঠিকই, কিন্তু রেখে যাবেন এক নতুন জাগরণের স্বপ্ন। তিস্তার চরে সেদিন কেবল নদীর শব্দ নয়, প্রতিধ্বনিত হবে মানুষের সৃজনশীল জয়গান।


















