নিজস্ব প্রতিবেদক : অবধৈ সিগারেট দমনে সফল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্যকে বদলীর পর ভ্যাট আদায়ে ধস নেমে এসেছে। পরিসংখ্যান বিবেচনায় রাষ্ট্রের উচিত ছিল তাকে পুরস্কৃত করা। উদ্বুদ্ধ নেতৃত্বের মাধ্যমে সারা দেশে সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি অভিযান পরিচালনা করে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সিগারেট খাতে রেকর্ড ১০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধিসহ ৫ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভ্যাট আদায়ে ভূমিকা রাখেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য, ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি বেলাল হোসাইন চৌধুরী। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বদলি, ওএসডি এবং দুদকের মামলার মুখোমুখি হন। জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়ে দেশব্যাপী তার ধারাবাহিক অভিযানে অবৈধ সিগারেট সিন্ডিকেট দিশেহারা হয়ে পড়ে। বাজারে অবৈধ সিগারেট দুর্লভ হয়ে পড়ে। ফলে বৈধ সিগারেটের বিক্রি বাড়ে এবং রাজস্বের অন্যতম বৃহত সিগারেট খাতের বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। করের হার না বাড়িয়ে সিস্টেম ঠিক করার মাধ্যমে ভ্যাট বৃদ্ধির পাশাপাশি সিগারেট খাত থেকে আগের বছরের তুলনায় পুরো অর্থ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায়ের পরিকল্পনা নেন।
স্বাধীনতার পর সিগারেট সিন্ডিকেট ধরাছোয়ার বাইরে থাকে। হাট বাজার পাড়া মহল্লায় চিরুনি অভিযানের কারণে তিনি তামাক-সংশ্লিষ্ট অন্দর-বাহিরের বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। জীবনের ঝুকি নিয়ে রাষ্ট্রের কোষাগার সমৃদ্ধকরণের নির্লোভ একনিষ্ঠ কাজ করেন। পুরস্কার হিসেবে গত ৭ অক্টোবর ২০২৫ তিনি বদলি হন। একই দিনে ২০১৮ সালের একটি বেনামী অভিযোগের সূত্র ধরে দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করে। জানা যায়, দুদকের অনুরোধে একই বেনামীর ২৪টি অভিযোগ ২০১৯ সালে এনবিআর তদন্ত করে একটিরও সত্যতা পায়নি। এর দুদিন পর তিনি ওএসডি হন।
ভ্যাট বিভাগে তার টিমের সহকর্মীদের ভাষ্য, সিন্ডিকেটের প্রলোভন ও ভীতির কাছে নতি স্বীকার করলে তিনি হয়তো বহাল তবিয়তে থাকতে পারতেন। তাদের মতে, বেলাল হোসাইন চৌধুরীর মতো দেশপ্রেমী, দক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিত্বের কর্মকর্তা মাথা নত না করায় ওএসডি হওয়াই যেন স্বাভাবিক পরিণতিতে দাড়ায়। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে জুলাই-অক্টোবর প্রথম চার মাসে সিগারেট খাতে ভ্যাট আদায় হয় ১৪ হাজার ৬৬৬.৬৪ কোটি টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের একই সময়ে আদায় ছিল ৮ হাজার ৫০৮.০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ অক্টোবর পর্যন্ত রাজস্ব আদায় বেড়েছিল প্রায় ৬ হাজার ১৫৮.৫৬ কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭২%। তিনি ওএসডি হওয়ার পরবর্তী সাত মাসে সিগারেট খাতে আদায় ৪২২.৩৯ কোটি টাকা কমে এবং প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১.৫৮%। তার মেয়াদে প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০২%। মে ২০২৬ মাসে আদায় হয় ১,৫২১.৩৮ কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ২৫%।
দীর্ঘ দিন সক্রিয় অবৈধ সিগারেট সিন্ডিকেটগুলো দেশব্যাপী সাড়াশি অভিযানের সময় চাপের মুখে পড়ে সে সময় নিজেদের অবৈধ ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তাই বিদায়ের পর গত ছয় মাসে অবৈধ সিগারেটের বাজার ৩১ শতাংশ বাড়ে। এ খাতের ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধি ৭২ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে নেমে যায়। প্রথম প্রান্তিকের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম : ২০২৫-২৬ এর প্রথম প্রান্তিকে লিকেজ কমিয়ে প্রকৃত ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যে তিনি গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেন। তিনি ভ্যাট আহরণের অন্যতম প্রধান খাত সিগারেট, ই-কমার্স এবং খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে ভ্যাট ফাকি রোধে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নেন। সিগারেট খাত: নিশ্চিদ্র পরিকল্পনা ও নিবিড় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ সিগারেট উদ্ধারে সারাদেশে তিন মাসে ১৩ হাজার ৪০৯টি অভিযানে নেতৃত্ব দেন। সমগ্র অর্থ বছরে সিগারেট খাতে লক্ষ্যমাত্রা ৪৭ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। তিনি ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নেন। নি¤œ ও উচ্চস্তরের সম্পূরক শুল্ক সমান ৬৭ শতাংশ নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন। গত ৯ জানুয়ারি এ বিষয়ে আইন পাস হয়। লাগাতার অভিযানের ফলে বৈধ সিগারেটের বিক্রি বাড়ে। জুলাই ২০২৫ মাসে বিএটির প্রদেয় রাজস্বে প্রবৃদ্ধি ৭০১ শতাংশ, জেটিআই ২০০ শতাংশ, আবুল খায়ের ১০০ শতাংশ এবং এনবিআরের মোট জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৩৯৪ শতাংশে পৌছায়। তার কর্মকালে সিগারেট খাতে প্রবৃদ্ধি জুলাই মাসে ৩৯৪% আগস্টে ১৭৩% এবং সেপ্টেম্বরে ১০২% অর্জিত হয়। তিনি ওএসডি হওয়ার পর নভেম্বর মাসে সিগারেট খাতের প্রবৃদ্ধি ০.৪ শতাংশে নামে। ভার্গো টোব্যাকো নামীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার টিম গত ১৭ আগস্ট ২০২৫ তারিখে এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানে ৪৫১ কোটি টাকার ফাকি উদঘাটন করে মামলা দায়ের করে। জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয় ১০২ শতাংশ। এর আগের পাঁচ বছরে সিগারেট খাতে প্রথম প্রান্তিকে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪.৪৬% (২০২৩-২৪) সামগ্রিক ভ্যাট আদায়ে মাঠের কর্মকর্তাদের দলগত কর্মঐক্য ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। মাঠের সফল ভ্যাট কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে ‘কমিশনার অব দ্য মান্থ’ পুরস্কৃত করেন। জুলাই ও আগস্ট ২০২৫ এ সামগ্রিক ভ্যাট আদায়ে মাসিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২.৪৫% ও ৩৩.৮৭%, যা গত পাচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তার ওএসডি হওয়ার পর অক্টোবর ২০২৫-এ প্রবৃদ্ধি ১০.৬৭ শতাংশে নামে। মার্চ ২০২৬-এ প্রবৃদ্ধি দাড়ায় ৪.৮৬ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে আয়কর ও ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা সমান ছিল। তার নেতৃত্বে ভ্যাট টিম আয়করের তুলনায় ১২ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা বেশি আদায় করে। ভ্যাট নেট বিস্তারে তিন বছরের রেকর্ড ভেঙে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি অর্জিত হয়।
বেনামীতে চাকরিচ্যুতির আবেদন: ২০১৮ এর ওই বেনামী অভিযোগে তাকে সাবেক প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মীয়, লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের তহবিল সংগ্রাহক, বিএনপি ও ছাত্রদলের ক্যাডারসহ বিভিন্নভাবে অন্তত ১৭ বার বিএনপির সম্পৃক্ত উল্লেখ করে বেলাল হোসাইন চৌধুরীর চাকরিচ্যুতির আবেদন করা হয়। অভিযোগে বর্তমান প্রধান মন্ত্রীর শ্বশুর বাড়িকে বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বাড়ি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। সূত্র জানায়, ততকালীন সরকার সমর্থিত বেনাপোল বেপরোয়া চোরাচালান সিন্ডিকেট ও বেপরোয়া চক্রকে শক্ত হাতে দমন করায় এ বেনামী অভিযোগের উৎপত্তি। ভ্যাট আদায়ে বাধা বিভিন্ন সিন্ডিকেট: বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থ বছর শুরু হলে তার নানামুখী পরিকল্পনায় ভ্যাট ফাঁকিবাজরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। তাকে প্রলোভনে বা বশে বিভিন্ন খাতের শক্তিশালী সিন্ডিকেট তাকে সরানোর জন্য সক্রিয় হয়ে অব্যাহত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেয়। এনবিআর চেয়ারম্যানের মন্তব্য: গত ৩০ আগস্ট ২০২৫ এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান তার বিরুদ্ধে অব্যাহত অপপ্রচার নিয়ে তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমদকে এক ক্ষুদে বার্তায় জানান, বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অপসাংবাদিকতা ও ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি সরকারের পক্ষে সাহসী অবস্থান নিয়ে কাজ করছেন এবং তিনি একজন ক্লিন অফিসার। ভ্যাটের রেজিস্ট্রেশন ও আদায়ের জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সাহসের সঙ্গে সারা দেশের জাল সিগারেটের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান চালিয়েছেন। এসব কারণেও অসৎ তামাক ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে লেগেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাকে সরিয়ে দেওয়ার পর অভিযানের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। অবৈধ সিগারেট সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। ফলে বৈধ সিগারেটের বাজার সংকুচিত ও ভ্যাট আদায় কমে যায়।


















