অপরাধচিত্র প্রতিবেদক: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ২৪ হলে মেসে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা কেন্দ্র করে শিবিরের এক কর্মীর ওপর ছাত্রদল নেতাকর্মী ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের হামলা ও মব তৈরির অভিযোগ উঠেছে, যার প্রেক্ষিতে দুই পক্ষই প্রক্টরের কাছে পাল্টা লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) শাখা ছাত্রদল সভাপতির বিরুদ্ধে আবাসিক হলে ডেকে শিবিরকর্মীর ওপরে মব সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী শিবিরকর্মী এবিষয়ে বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৫ জুলাই বুধবার বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় চব্বিশ হলের দ্বিতীয় তলায় করিডরে হল প্রভোস্টের সামনে মব সৃষ্টির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শিবিরকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী মো. ইনামুল হক। লিখিত অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন ও ছাত্রদলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অংকনসহ ইতিহাস বিভাগের সাকিবসহ ২০-২৫ জনকে অভিযুক্ত করেছেন শিবিরকর্মী ইনামুল হক।
এদিকে ভুক্তভোগী শিবির কর্মী ইনামুল হকের বিরুদ্ধেও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবকে মেসের মিটিংয়ে মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং এবিষয়েও প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। তবে শিবিরকর্মী এনামুলের দাবি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচার পেতে চাইলে আগেই তিনি প্রশাসন বরাবর লিখিত দিতেন। তাকে মারধর এবং তার লিখিত দেওয়ার পর সাকিবের এমন লিখিত দেওয়াটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
প্রত্যাক্ষদর্শীরা বলেন, হলের দ্বিতীয় তলায় টিভিরুম থেকে আমরা দেখি একজনকে মারধর করতে করতে ২০-২৫ জন টিভি রুমের ভিতরে নিয়ে চলে আসে তখন আমরা গিয়ে থামানোর চেষ্টা করি।
লিখিত অভিযোপত্রে ভুক্তভোগী শিবির কর্মী উল্লেখ করেছেন, ‘গত মঙ্গলবার আমার মেসের সদস্যদের মধ্যে মনোমালিন্য হয় যা মেস লাইফের সাধারণ ঘটনা। পরবর্তীকালে তা সমাধানও হয়ে যায়। কিন্তু এর জের ধরে আজ ১৫/০৭/২৬ তারিখে দুপুর ৪টা নাগাদ (বিজয় ২৪) হলে ইতিহাস বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেন আমাকে ডেকে নিয়ে আসেন। তিনি আমাকে অপেক্ষা করতে বলেন। আপক্ষারত অবস্থায় ইতিহাস বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৌরভ ও সাকিবের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন আমার ওপর অতর্কিত হামলা করে হত্যার চেষ্টা করেন, ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থ অংকনের উপস্থিতিতে।’
লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তারা পরিকল্পিতভাবে আমার মাথায় আক্রমন করতে থাকে। আমি আশ্রয়ের জন্য উক্ত হলের প্রভোস্ট স্যারের কাছে আশ্রয় নিই। স্যারকে না পেলে আমার জীবন নাশ হওয়ার ঘটনা ঘটতো। আমার উপর আক্রমণের সম্পূর্ণ ঘটনাটাই বিজয় ২৪ হলের ২য় তলার সিসিটিভির সামনেই ঘটে।’
ভুক্তভোগী দাবি জানিয়েছেন, ‘অতি সত্তর নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সিসিটিভ ফুটেজ দেখে তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দান করে ক্যাম্পাসের মবসৃষ্টি রুখে দিবেন।’
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবের অভিযোগ, মেসের মিটিংয়ে তুচ্ছ ঘটনায় আমি স্ট্রোকের রোগী হওয়া সত্ত্বেও ইনামুল হক আমাকে গালে একটা চড় মারে এবং বুকে চড় মেরে ফ্লোরে ফেলে দেয় এবং তার মেসের বাংলা ডিপ্টের তথাকথিত শিবিরকে নিয়ে আমার ওপর হামলা চালায় এবং আমাকে ও সৌরভকে রাত ২:৩০ মিনিটে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের আশিক রুম থেকে বের করে দেয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এর যথাযথ বিচার চাই।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মিনহাজুল ইসলাম বলেন, “পূর্ববর্তী মীমাংসিত বিষয়ে প্রভাবশালী একজনের সহযোগে আজকে বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের এনামুলক হক রায়হানকে হলে ডেকে ২য় বর্ষের ২০-২৫ যে নারকীয় হামলা করলো সঠিক তদন্তসাপেক্ষে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি, যথাসময়ে প্রোভোষ্ট স্যারের উপস্থিতি এবং সিসিটিভি না থাকলে দ্বিতীয় আবরার ফাহাদের সাক্ষী হত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।”
অভিযুক্ত ছাত্রদল সাংস্কৃতিক সম্পাদক অংকন বলেন, “আমার নেতৃত্বে মারামারি হয়েছে—এ কথা সঠিক নয়। সমস্যা সমাধানের জন্য ছাত্রদলের সভাপতি মোশারফ ভাই আমাকে ডাকলে আমি ১৩ জন জুনিয়রকে নিয়ে বিজয়–২৪ হলের টিভি রুমের দিকে যাই। সেখানে এনামুল ভাই ছিলেন, তবে আমি প্রথমে তাঁকে খেয়াল করিনি। হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখি মারামারি হচ্ছে। এরপর আমি মারামারি থামানোর চেষ্টা করি এবং এনামুল ভাইকে নিরাপদে টিভি রুমে নিয়ে যাই।’
অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ডেকে নিয়ে হামলা চালানোর যে অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে করা হচ্ছে সেটা একদম ভিত্তিহীন। আমি হলে ডেকে মেসে ঘটে যাওয়া ঘটনার সমাধানের জন্য ডাকি দু’গ্রুপকেই। আমি হলের প্রোগ্রামে ব্যস্ত থাকায় উভয়কে বলি হলে অপেক্ষা করতে এর মধ্যে ইনামুলকে ইতিহাস বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী মারধর করেছে বলে জেনেছি তবে মারধরের বিষয়ে আমি একদম অবগত ছিলাম না।
বিজয় চব্বিশ হলের প্রভোস্ট মো. আরিফ উল ইসলাম বলেন, এটি একদম অরাজনৈতিক বিষয়, দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্য একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। প্রথমে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মেসে একটি বিষয় নিয়ে ইতিহাসের এক শিক্ষার্থীকে মেরেছে; ঐটার সমাধানে বিজয় চব্বিশ হলে আসলে ঐ শিক্ষার্থীকেও মারধর করেছে ইতিহাস বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী। এবিষয়ে অভিযুক্ত যারা রয়েছে তাদেরকে আমরা শক্তভাবে দমন করবো, উভয় পক্ষ লিখিত অভিযোগ দিলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, ঘটনা দুই পক্ষের কাছ থেকে শুনছি। তারাসহ তাদের বিভাগের শিক্ষকরা আসছিল। তারা বলেছে আমরা শুনছি। একটি ঘটনার লিখিত অভিযোগ পেয়েছি আমরা বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবো।


















