অপরাধচিত্র প্রতিনিধি (সাতক্ষীরা) : সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মাছের ঘেরে নদীর পানি ওঠানোর জন্য, যত্রতত্র কেটে প্রভাবশালী ঘের মালিকদের নাইন্টি পাইপ বসানোর কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরাকে ঘিরে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভাগ-১ এর আওতাধীন ১৫ নম্বর পোল্ডারের উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধের ইউনিয়নের চকবারা, ডুমুরিয়া, চাদনীমুখা, ৯ নম্বর সোরাসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব নাইন্টি পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা সম্প্রতি বাঁধের উপরিভাগে দেওয়া পাথর ও সিমেন্টের ব্লক সরিয়ে বাঁধ কেটে এবং ছিদ্র করে, সেখানে এসব পাইপ স্থাপন করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইলা, সিডর, আম্ফান প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে অর্ধশতাব্দী আগে নির্মিত উপকূলের বেড়িবাঁধ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাঁধ ভেঙে উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে, বিভিন্ন সময় প্রাণহানিসহ হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাঁধ ভাঙন প্রতিরোধে, সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-১ এর আওতাধীন ১৫ নম্বর পোল্ডারে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে মোট ১ হাজার ২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। তবে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই বেড়িবাঁধের শতাধিক জায়গায় প্রভাবশালী ঘের মালিকরা কাটাছেঁড়া করে বসিয়েছেন নাইন্টি পাইপ। অনেক স্থানে নৌকা আটকানোর জন্য বাঁধ খুঁড়ে খুঁটি বসানো হয়েছে, যা উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধকে দুর্বল করে তুলছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ঘের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে বাঁধটি হুমকির মুখে পড়ছে।
গাবুরার চাঁদনীমুখা বাজার থেকে পার্শ্বেমারি পর্যন্ত খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের তিন কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ কেটে অন্তত ২০ থেকে ৩০টি স্থানে নাইন্টি পাইপ বসাতে দেখা গেছে। ৯ নম্বর সোরা ও চকবারা এলাকার খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ কেটে বসানো হয়েছে ১২ থেকে ১৫টি নাইন্টি পাইপ।
২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ৯ নম্বর সোরা, পার্শ্বেমারির শেখ বাড়ি এলাকায় বাঁধ ভেঙে গাবুরা ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছিল। ভেঙে যাওয়া স্থান পরে মেরামত করে পাউবো। সেসব জায়গায়ও নাইন্টি পাইপ বসিয়ে লোনাপানি উত্তোলন করতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বেড়িবাঁধে অবৈধ ‘নাইন্টি’ পাইপ বসিয়ে নদ-নদী থেকে লবণ পানি প্রবেশ করিয়ে মৎস্যচাষ করছেন। এর ফলে বেড়িবাঁধ ক্ষতির মুখে পড়ছে।
গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম জানান, ইতোমধ্যে গাবুরা ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের ওপর স্থাপিত সব অবৈধ ‘নাইন্টি’ পাইপ অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতেও কোনো ব্যক্তি বেড়িবাঁধ বা জনসাধারণের চলাচলের পথে অবৈধভাবে ‘নাইন্টি’ স্থাপন করতে পারবেন না।
তিনি জানান, মৎস্যঘের পরিচালনার জন্য বিদ্যমান মিনি স্লুইস গেট ও সাধারণ স্লুইস গেট ব্যবহার করতে হবে। কেউ আইন অমান্য করে, প্রভাব খাটিয়ে বা জোরপূর্বক নাইন্টি পাইপ বসালে, তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একইসঙ্গে নদী, বেড়িবাঁধ, সড়ক ও পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে আইন মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ- ১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান সরদার বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত গাবুরার চারপাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। অনেকে নৌকা আটকানোর জন্য খুঁটি স্থাপনের পাশাপাশি, কয়েকজন নির্মাণাধীন বাঁধ কেটে পাইপের সাহায্যে নাইন্টি স্থাপন করেছে। বাঁধের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিজে থেকে নাইন্টিগুলো অপসারণে নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও স্থানীয়রা তাতে কর্ণপাত করেনি। বাধ্য হয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে গত ৬ জুলাই সকাল থেকে বাঁধের জন্য ক্ষতিকর নাইন্টিগুলো অপসারণ করা শুরু হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা, ডুমুরিয়া, চাদনীমুখা ও ৯ নম্বর সোরা এলাকার বাঁধ হতে এরইমধ্যে ১২টি নাইন্টি অপসারণ করা হয়েছে।’
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজররুল ইসলাম বলেন, ‘গাবুরার উন্নয়ন ও মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না। এলাকার স্বার্থই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন টেকসই বেড়িবাঁধ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়- এমন কোনো অবৈধ কার্যক্রম বরদাস্ত করা হবে না।’


















