অপরাধচিত্র প্রতিনিধি (বরগুনা): বরগুনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. লুৎফুন্নাহার লনীকে অনৈতিক প্রস্তাব, অশালীন ইঙ্গিত এবং কোনো কাজ ছাড়াই নিজের অফিস রুমে ডাকার অভিযোগে একই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব (শৃঙ্খলা-২ শাখা) মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর গত ২২ জুলাইয়ের স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আবাসিক সার্জন ডা. লুৎফুন্নাহার লনী হাসপাতালে যোগদানের পর থেকেই তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম সুযোগ পেলেই কোনো কারণ ছাড়াই তাকে নিজের অফিস কক্ষে ডাকতেন এবং অনৈতিক প্রস্তাব বা কুপ্রস্তাব এবং অশালীন ইঙ্গিত করতেন। যা সরকারি চাকরি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণ হিসেবে গণ্য। তাই, ডা. মো. রেজওয়ানুর আলমকে অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত করা হলো। একই সঙ্গে উক্ত বিধিমালার অধীনে চাকরি হতে বরখাস্তকরণ অথবা কেন উপযুক্ত দণ্ড প্রদান করা হবে না, সে বিষয়ে নোটিশ প্রাপ্তির ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত শুনানি চান কি না, তাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে।
এদিকে, গত ১৪ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে এক লিখিত অভিযোগে আবাসিক সার্জন ডা. লুৎফুন্নাহার লনী জানান, চলতি বছরের ৬ জুন বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে যোগদানের পর থেকেই তত্ত্বাবধায়ক তাকে বিভিন্ন সময় অফিস কক্ষে ডেকে মানসিক হয়রানি ও অনৈতিক কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দিতেন। অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত ১৩ জুলাই সকালে তত্ত্বাবধায়ক তাকে হোয়াটসঅ্যাপ কলে ডেকে তার ডরমিটরির কক্ষে একসঙ্গে সময় কাটানোর অনৈতিক প্রস্তাব দেন। এতে রাজি না হওয়ায় পরের দিন হাসপাতালে দায়িত্ব চলাকালে প্রকাশ্যে স্টাফ ও নার্সদের সামনে তাকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। সে সময় নিজেকে চরম নিরাপত্তাহীন মনে করে বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার আবেদন জানিয়েছিলেন লনী।
পরে ২১ জুলাই হাসপাতালে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের উপস্থিতিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার প্রেক্ষিতে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে মর্মে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব বরাবরে অভিযোগটি প্রত্যাহারের আবেদন করেন ডা. লুৎফুন্নাহার লনী। কিন্তু এক দিনের ব্যবধানে ২২ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবরে পাঠানো আরেক আবেদনপত্রে ডা. লুৎফুন্নাহার লনী সেই প্রত্যাহারের আসল নেপথ্য ঘটনা উন্মোচন করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ২১ জুলাই হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক তাকে চাকরির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতির ভয়ভীতি দেখান। একই সঙ্গে তাকে হয়রানিমূলক বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট ও সাংবাদিকদের পোস্ট দেখিয়ে চরম ভীত-সন্ত্রস্ত করে অভিযোগ প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক তার কক্ষে সাংবাদিকদের ডেকে এনে ডা. লনীকে কথা বলতে বাধ্য করেছিলেন।
ডা. লনী তার নতুন আবেদনে আরও উল্লেখ করেন, জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর যেন কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে কথা বিবেচনা করে তিনি সে সময় চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের সামনে মূল বিষয় গোপন রেখে বক্তব্য দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ভীতি প্রদর্শন করে বক্তব্য নেওয়া হলেও গত ১৪ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলমের বিরুদ্ধে আনীত মূল অভিযোগে তিনি এখনও সম্পূর্ণ অটল রয়েছেন এবং আনীত সব অভিযোগের পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। তাই, তার পূর্বের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা ও তদন্ত গ্রহণের আকুল আবেদন জানান।
এ বিষয়ে ডা. লুৎফুন্নাহার লনী বলেন, আমার অভিযোগের বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সে অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আমি ন্যায্য বিচার দাবি করছি। মাঝখানে অভিযোগ প্রত্যাহারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাকে চাপ সৃষ্টি করে অভিযোগ প্রত্যাহারের একটি আবেদন নেওয়া হয়েছিল।
ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম এ বিষয়ে বলেন, ডা. লুৎফুন্নাহার লনী হাসপাতালে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করে অন্যত্র গিয়ে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতেন। আমি সে বিষয়ে নোটিশ করার কারণে তিনি আমার বিরুদ্ধে এ মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। তিনি আরও বলেন, আমি হাসপাতালের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি।
এদিকে, হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে সমালোচনার ঝড় চলছে। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে দোষী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।

















