নিজস্ব প্রতিবেদক :
বিএসটিআই জনগণকে অনুরোধ করেছে, ‘গুজব বা আতঙ্কে বিভ্রান্ত না হয়ে নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, টুথপেস্ট গিলে ফেলবেন না এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর আস্থা রাখুন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিক সত্যনিষ্ঠা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় বিএসটিআই সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত এক গবেষণায় টুথপেস্টের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার তথ্য প্রকাশের পর জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক একটি উদীয়মান পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের বিষয়। তবে এর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে এখনো গবেষণা চলমান। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এতে আরও বলা হয়, সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে ‘মাইক্রোবিড-ফ্রি ওয়াটারস অ্যাক্ট অব ২০১৫’-এর মাধ্যমে টুথপেস্টসহ ধুয়ে ফেলা হয় এমন কসমেটিকস পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ইউরোপীয় আইন ‘রেগুলেশন (ইইউ) ২০২৩/২০৫৫’-এর আওতায় টুথপেস্টসহ ধুয়ে ফেলা হয় এমন কসমেটিকস পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে উৎপাদনকারীদের ১৭ অক্টোবর ২০২৭ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে সংযোজিত প্লাস্টিকের মাইক্রোবিড ব্যবহার নিষিদ্ধ। তবে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের স্ট্যান্ডার্ড কিংবা আইএসও, এএসটিএম প্রভৃতি আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণকারী সংস্থার প্রণীত মানে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা বা ব্যবহার নিষিদ্ধের বিষয় উল্লেখ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য কোনো নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সীমা বা একক পরীক্ষাপদ্ধতিও এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, টুথপেস্ট পণ্যের জন্য বিডিএস ১২১৬:২০১২ ‘স্পেসিফিকেশন ফর টুথপেস্ট’ শিরোনামে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। এসআরও নং ৫০-আইন/২০১৯ এবং এসআরও নং ৫১-আইন/২০১৯ জারির মাধ্যমে সরকার টুথপেস্ট বিক্রি ও বিতরণের ক্ষেত্রে বিএসটিআই থেকে উক্ত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী রাসায়নিক, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মানদণ্ড পরীক্ষার পর লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিএসটিআই প্রণীত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার সম্পর্কে সরাসরি কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও টুথপেস্ট উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য ৮১টি উপাদানের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উল্লেখ নেই। বিএসটিআই থেকে সনদ দেওয়ার সময় টুথপেস্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যাচাই করা হয়। ফলে টুথপেস্ট উৎপাদনে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সুযোগ নেই।
বিএসটিআই জানিয়েছে, শুধু কোনো পরীক্ষায় প্লাস্টিকজাত কণা পাওয়া গেছে বলেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছে বা তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এ জন্য আরও বিস্তারিত পরীক্ষা, কণার ধরন, উৎস, পরিমাণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন। এ কারণে বিএসটিআই ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পরীক্ষাপদ্ধতি, পরীক্ষার ‘র ডেটা’ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল, পণ্যের উপাদান এবং সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিএসটিআই নিজ উদ্যোগে বাজার ও কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেশি বা বিদেশি স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনরায় স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যদি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, কোনো পণ্য বাংলাদেশ মান পূরণ করেনি অথবা অনুমোদনহীন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা টুথপেস্টকে অনিরাপদ বা নিম্নমানের বলে ঘোষণা করাও সঠিক হবে না বলে মত দেয় বিএসটিআই।
বিএসটিআই জানায়, ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, দন্ত চিকিৎসক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে টুথপেস্টের বাংলাদেশ মান পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, উপাদান প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং পরীক্ষাপদ্ধতি সংযোজনসহ বাংলাদেশ মান হালনাগাদ করা হবে।
বিএসটিআই জনগণকে অনুরোধ করেছে, ‘গুজব বা আতঙ্কে বিভ্রান্ত না হয়ে নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, টুথপেস্ট গিলে ফেলবেন না এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর আস্থা রাখুন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিক সত্যনিষ্ঠা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় বিএসটিআই সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’


















