নিজস্ব প্রতিবেদক :
ইট-পাথরে তৈরি বড় বড় দালান আর সংকীর্ণ রাস্তায় ঠাসা ঢাকা শহরে বড় কোনো জলাধার নেই বললেই চলে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় নগরী, আর তীব্র রোদে হয়ে ওঠে তপ্তদ্বীপ। সেইসঙ্গে পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের জন্য বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি ঢাকা শহরকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ ২০২২-৩৫) বক্স কালভার্টে ঢেকে ঢাকার খালগুলো উন্মুক্ত করে নৌপথ পুনরুদ্ধারের সুপারিশ করা হয়েছে।
জানা যায়, একসময় রাজধানীর বুক চিরে বয়ে যেতো আকাবাঁকা খাল। বর্তমানে তার কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে। এর একটি ধানমন্ডি লেক। জানা যায়, এটি একসময় ধানমন্ডি খাল নামে পরিচিত ছিল। ধানমন্ডি লেক থেকে শুরু হয়ে খালটি মিশেছে বেগুনবাড়ি খালে অর্থাৎ বর্তমান হাতিরঝিলে। এটি কাঁঠালবাগান, রাজাবাজার ও পরীবাগ খালের (বর্তমান শাহবাগ) মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে এই পুরো খালের ওপর বক্স কালভার্ট তৈরি করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়। যা বর্তমানে ‘পান্থপথ’ বক্স কালভার্ট হিসেবে পরিচিত।
এই বক্স কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা হয় ১৯৮৮ সালের পর। ওই বছল বন্যায় সারা দেশের সঙ্গে ঢাকা শহরের অনেক এলাকা ডুবে যায়। এরপর ঢাকাকে বন্যা ও জলাবদ্ধতামুক্ত করার লক্ষ্যে রাজধানীর বড় বড় খালের ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ শুরু করে সরকারি সংস্থা ঢাকা ওয়াসা ও তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। তবে সরকারি পর্যবেক্ষণে বক্স কালভার্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ হয়েছে। সর্বশেষ প্রণীত ড্যাপে বলা হয়েছে, ঢাকার হারিয়ে যাওয়া খাল, প্রাকৃতিক জলাধার ও নৌপথ পুনরুদ্ধার ছাড়া ঢাকাকে সচল করার দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
১৬১০ সালে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান ঢাকার নিরাপত্তা ও নৌ যোগাযোগের সুবিধার্থে ধোলাইখাল খনন করেন। এটি বালু নদ থেকে এসে বুড়িগঙ্গায় মিশেছিল। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে এটি ছিল পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ও প্রধান নৌপথ। ১৯৯০-এর দশক থেকে পরবর্তী বিভিন্ন সময়কালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ধোলাইখাল-১ ও ধোলাইখাল-২ ভরাট করে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করে। এর ওপর তৈরি হয় রাস্তা ও বাজার।
ঢাকার আরেকটি বড় খাল ছিল সেগুনবাগিচা খাল। রমনা ও মৎস্য ভবনের আশপাশের জলাশয় (রমনা লেক ও তৎকালীন ঝিল) থেকে প্রায় ২.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেগুনবাগিচা খালটি বিজয়নগর, আরামবাগ, ফকিরাপুল ও কমলাপুর হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছন দিয়ে প্রবাহিত হতো। ২০০০ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ওয়াসা এ খালের ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করে। পরবর্তী সময়ে রাজউক এর ওপর তৈরি করে সড়ক।
বড় তিনটি খালকে বক্স কালভার্টে রূপান্তরের পরও ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। বরং বিভিন্ন মেগা অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ না হওয়ায় ঢাকার জলাবদ্ধতা আরো জটিল রূপ ধারণ করেছে। এমন বাস্তবতায় ঢাকার ভেতরের বক্স কালভার্টগুলা উন্মুক্ত করে খাল উদ্ধার করে সেগুলোকে নৌপথ হিসেবে ব্যবহার করার সুপারিশ করা হয়েছে। ড্যাপের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর অভ্যন্তরীণ খালগুলো ব্যবহার করে ৫৭৪ কিলোমিটার নৌপথ তৈরি করা প্রয়োজন। আর বৃহত্তর ঢাকায় ১ হাজার ১৩৫ কিলোমিটার নৌপথ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার চারপাশে চারটি বড় নদী ও শহরের ভেতর অর্ধশতাধিক খাল রয়েছে। বেশ কয়েকটি বড় খালের ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করায় নগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। সেইসঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এমতাবস্থায় খালগুলো উন্মুক্ত করতে পারলে ভোগান্তি কমে আসবে।


















