নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীর গুলশানে ‘অননুমোদিত’ দুই গুদামে শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের দুটি বৈধসহ চারটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে। টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড নামে ওই ওয়্যারহাউসে অভিযান চালিয়ে এর বাইরে আরও দুটি ওয়্যারহাউসে পণ্য মজুতের সন্ধান মেলায় চারটি ওয়্যারহাউসই সিলগালা করেছে গোয়েন্দা সংস্থা।
গুলশান-১ এর ১৩১ নং সড়কের ৬০/সি নম্বর প্লটের ওই ওয়্যারহাউজে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টা থেকে শুরু করে শুক্রবার (২ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এই অভিযান চালানো হয়।
জানা গেছে, গুলশানের সাউথ এভিনিউতে অবস্থিত মেসার্স টস বন্ড (প্রাইভেট) লিমিটেড নামে ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মালিক হলেন শেখ নূর ইসলাম। তিনি দেশের পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১ (এসআরবি) এ অভিযান চালায়।
অভিযানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত বা ঘোষিত ওয়্যারহাউস রয়েছে দুটি। তবে সরেজমিনে পরিদর্শনে মোট চারটি ওয়্যারহাউসে পণ্য মজুত রাখার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। এর মধ্যে দুটি ওয়্যারহাউস অনুমোদিত তালিকার বাইরে বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।
বিশেষ করে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য, যার মধ্যে মদও রয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিযানে সংশ্লিষ্টরা। অনুমোদনবহির্ভূত ওয়্যারহাউসে স্থানান্তর বা মজুত করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউজ’ থেকে কেবল বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিক এবং আইন অনুযায়ী বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের শুল্কমুক্ত মদ কেনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু টস বন্ডের বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ ওঠায় তা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই অনুসন্ধান চলছিল।
এনবিআরের সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট কানাডা থেকেও গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছে। তাতে নুর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের সেখানে নাগরিকত্বসহ ‘সন্দেহজনক’ লেনদেন ও অন্তত চারটি কোম্পানির মালিকানা থাকার অস্তিত্ব মিলেছে।
সেখানকার গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ঢাকার এ বন্ডেড ওয়্যারহাউজের পরিচালক হিসেবে নাম আছে নুর ইসলাম, তার স্ত্রী শীলা ইসলাম ও মেয়ে তাসনিম ইসলামের।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদ মুরাদ জানান, টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড নামক মদের ওয়্যারহাউসে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা মদ ও বিয়ার সংরক্ষণ এবং হিসাব ব্যবস্থাপনায় একাধিক অনিয়ম শনাক্ত করা হয়। পরে কাস্টম কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কাস্টমস আইন অনুযায়ী ডিএনসির উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউস সিলগালা করে।
তিনি আরও বলেন, অভিযানকালে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অনুমোদিত সফটওয়্যার এবং গুদামে সংরক্ষিত পণ্যের সরেজমিন তথ্য যাচাই করেন। এ সময় সফটওয়্যারে এক্সবন্ড দেখানো হলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউসে থাকা ১৪৪ ক্যান বিয়ার, ১২ বোতল হুইস্কি এবং ৬ বোতল নেমিরফ পাওয়া যায়। অর্থাৎ সফটওয়্যারে পণ্যগুলো প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড় হয়েছে বলে দেখানো হলেও সরেজমিনে সেগুলো প্রতিষ্ঠানের হেফাজতে পাওয়া যায়।
এ ছাড়া আমদানি করা ২ হাজার ২৫০ কার্টন হেইকেন বিয়ার প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার সিস্টেমে গত ৩ সেপ্টেম্বর ইনবাউন্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়। কিন্তু যৌথ অভিযানে যাচাই করে দেখা যায়, ওই পণ্যগুলো প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউসে বাস্তবে পাওয়া যায়নি।
তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানের মোট চারটি ফ্লোরের মধ্যে দুটি ফ্লোরের কাস্টমসের অনুমোদন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য/অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল-আমিন শেখ জানান, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্যের হিসাব, অনুমোদিত গুদাম এবং বাস্তবে ব্যবহৃত ওয়্যারহাউসের তথ্যের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পণ্য সরানো বা অপসারণ ঠেকাতে চারটি ওয়্যারহাউসই সিলগালা করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে জানতে চেষ্টা করলেও টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


















