জাহিদ হাসান, নেত্রকোণা প্রতিনিধি:
আদালতের স্পষ্ট ‘স্থিতাবস্থা’ (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ রয়েছে, বিবাদী পক্ষের হাতে পৌঁছেছে পুলিশের নোটিশও। তবুও এক অদৃশ্য শক্তির দাপটে আদালতের নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিরোধপূর্ণ জমিতে দেদারসে চলছে স্থাপনা নির্মাণের কাজ। নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলায় একটি প্রভাবশালী চক্রের এমন আইন অমান্যের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।
মামলার বিবরণ ও বিরোধের সূত্রপাত
আদালত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পাতিমুজি মৌজার চার শতাংশ বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানা নিয়ে কলমাকান্দা সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে (মোকদ্দমা নং-১৭২/২০২৪)।
মামলার বাদী সুনীতি পাল দাবি করেন, ১৯৯৫ সালের ৪ জানুয়ারি (১৩৩ নম্বর দলিল মূলে) তেলিগাঁও গ্রামের দেবেন্দ্র চন্দ্র পাল ও তার ছেলে রতন কুমার পালের কাছ থেকে জমিটি বৈধভাবে ক্রয় করেন তিনি।
আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও বাস্তব চিত্র
মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নালিশি জমিতে নতুন কোনো ভবন নির্মাণ কিংবা জমির প্রকৃতি পরিবর্তন না করার জন্য বিবাদী পক্ষ—নিরঞ্জন পাল, রুহিদাস পাল, সুনীল পাল ও ভারত পালসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন আদালত। সরেজমিনে দেখা গেছে, আদালতের এই স্থিতাবস্থা আদেশ বহাল থাকা সত্ত্বেও বিরোধপূর্ণ জমিতে জোরপূর্বক ভবন নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
জমির কোনো বৈধ দলিল নেই বিবাদীদের
প্রতিপক্ষ নিরঞ্জন পাল দুই দিন আগে কলমাকান্দা থানা পুলিশের মাধ্যমে আদালতের নোটিশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে কোনো বৈধ দলিল না থাকার পরও জমিতে তাদের দাবি রয়েছে বলে জানান। তিনি উল্টো যুক্তি দিয়ে বলেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) নির্বাচনী বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ টাকা বরাদ্দের একটি প্রকল্পের কাজ তারা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাদী পক্ষ
জমির মালিক সুনীতি পাল ও তার কন্যা শিপ্রা পাল অভিযোগ করেন, “একটি প্রভাবশালী চক্র অদৃশ্য শক্তির দাপটে নির্মাণকাজ চালাচ্ছে, যা স্পষ্ট আদালত অবমাননা।” তারা আরও অভিযোগ করেন, নিরঞ্জন পালসহ বিবাদীরা বছরের পর বছর ধরে তাদের একা পেয়ে জমি দখল, মারধর, অত্যাচার ও নির্যাতনসহ খুন-জখমের হুমকি দিয়ে আসছে। বর্তমানে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং এই বিষয়ে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
আইনি ব্যাখ্যা ও প্রশাসনের বক্তব্য
মামলার আইনজীবী সুরজ্ঞন দাস জানান: ”আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছিল মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জমির বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না। চলমান এই নির্মাণকাজ সরাসরি আইন অবমাননার শামিল।”
কলমাকান্দা থানা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সজল সরকার জানান, আদালতের স্থিতাবস্থার নির্দেশ পেয়ে যথাযথভাবে বিবাদী পক্ষকে নোটিশের মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। সেখানে বিবাদীগণ কর্তৃক কোনো স্থাপনা তৈরি বা শান্তি ভঙ্গ করার কোনো সুযোগ নেই।
যোগাযোগ করা হলে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, “আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে এভাবে প্রভাব খাটিয়ে ভবন নির্মাণ চলতে থাকলে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও অনীহা কমবে, যার ফলে এলাকায় অপরাধ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
















