হবিগঞ্জ প্রতিনিধি :
হবিগঞ্জ জেলায় প্রাথমিক শিক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল ও শিক্ষক সংকট বিরাজ করছে। জেলা থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ বছরের পর বছর শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিদ্যালয় তদারকি ও শিক্ষার মানোন্নয়ন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একইসঙ্গে জেলার ১ হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫৩৯টি সহকারী শিক্ষক ও ২১৮টি প্রধান শিক্ষকের পদ খালি থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের ২০২৬ সালের জনবল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলার মোট ১৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র আটজন, অর্থাৎ অর্ধেক পদই শূন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দুটি অনুমোদিত পদের কোনোটিতেই কর্মকর্তা নেই। একইভাবে কম্পিউটার অপারেটরের তিনটি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন, ফলে তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া অফিস সহায়ক, হিসাব সহকারী, উচ্চমান সহকারীসহ বিভিন্ন পদেও জনবল সংকট রয়েছে। ফলে একটি সীমিত জনবল দিয়েই জেলার বিস্তীর্ণ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ উপজেলা পর্যায়ে। জেলার ৯টি উপজেলার শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৮টি অনুমোদিত কর্মকর্তার পদের বিপরীতে শূন্য ৩৬টি পদ। অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশ পদে কর্মকর্তা নেই। সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে। ৪৮টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ১৫ জন, শূন্য ৩৩টি। ফলে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক ইউনিয়ন ও বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
উপজেলা পর্যায়ে উচ্চমান সহকারী পদের ৯টির মধ্যে দুটি শূন্য, অফিস সহকারী কাম তথ্য বিন্যাসকারী পদের ১৯টির মধ্যে ১৬টি শূন্য, হিসাব সহকারী পদের নয়টির মধ্যে চারটি এবং অফিস সহায়ক পদের আটটির মধ্যে আটটিই শূন্য রয়েছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পদশূন্যতার চিত্রও উদ্বেগজনক। নবীগঞ্জ, বানিয়াচং, চুনারুঘাট, মাধবপুর, বাহুবল ও লাখাই উপজেলায় সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। অনেক উপজেলায় মাত্র একজন কর্মকর্তা দিয়েই পুরো উপজেলার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তথ্য বলছে, জেলায় ১ হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক রয়েছেন পাঁচ হাজার ৯৪৩ জন, বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৫৩৯টি শিক্ষক পদ। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক নেই ২১৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এতে অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ছাড়াই পাঠদান চলছে।
গৌরাঙ্গের চক বাবুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারা বেগম বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণি নিতে হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার মান ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজও সামাল দিতে হয়। শিক্ষক সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
লাখাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জামাল উদ্দিন বলেন, পর্যাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পাঠদানের মান মূল্যায়ন, প্রশাসনিক নজরদারি এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ হলে শিক্ষার মান অনেক গুণ বেড়ে যাবে।
বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইলিয়াস বখ্ত চৌধুরী জালাল বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে হলে দ্রুত শূন্য পদে কর্মকর্তা ও শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা জরুরি। অন্যথায় সরকারের মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, ইতোমধ্যেই কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষক সংকটের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। জনবল সংকটের কারণে শিক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা করতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়বে, বিদ্যালয়গুলোর তদারকি বাড়বে এবং শিক্ষার্থীরা আরও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পাবে।


















