ড্রেজার ও কার্গো দিয়ে রাতভর বালু উত্তোলন; প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, জরুরি হস্তক্ষেপ চান এলাকাবাসী
আবদুল্লাহ আল মামুন, সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ এবং বালু উত্তোলনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ অমান্য করে খোলপেটুয়া নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকা ও লোকালয়ের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। ড্রেজার মেশিন, কার্গো ও বাল্কহেড ব্যবহার করে নদী থেকে বালু উত্তোলনের পাশাপাশি লোকালয়ে বোরিং করেও বালু তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ, জনবসতি ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালের ১৬৩৯২ নম্বর রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ থাকা সত্ত্বেও শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। ১৪৩৩-১৪৩৪ বঙ্গাব্দ অর্থবছরে সাতক্ষীরা জেলায় কোনো বালুমহাল ঘোষণা করা হয়নি বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এরপরও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বালুর স্তূপ গড়ে তুলে বড় অঙ্কের ব্যবসা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নদীর চর ও বেড়িবাঁধের পাশে বালুর স্তূপ:
স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্যামনগরের নওয়াবেকী বাজারের দক্ষিণে আরাব আলী, জামান সাহেব ও সাবেক এক ইউপি সদস্যের বাড়ির পাশের নদীর চর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের ভেতরের এলাকায় বালু মজুত করা হচ্ছে। এসব বালু বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
এ ছাড়া বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের মাসুদ মোড়, দাতিনাখালী চেয়ারম্যান মোড় এবং মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পাশেও বালুর স্তূপ করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পাশের বালুর ব্যবসার সঙ্গে ফেরদাউস নামের এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নওয়াবেকী এলাকার বড় কুপটের একাধিক বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলপেটুয়া নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকা থেকে ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে বড় বড় কার্গোতে বালু তোলা হয়। রাতের অন্ধকারে এ কার্যক্রম চলায় নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন ও মজুতের কার্যক্রম চললেও তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি গোলা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় স্থানীয় লোকজন একটি কার্গোসহ দুজনকে আটক করেন। পরে বিষয়টি তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইনকে জানানো হয় বলে দাবি এলাকাবাসীর।
তাঁদের অভিযোগ, খবর দেওয়ার পরও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যাননি। পরে সন্ধ্যার দিকে সেখানে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা না করে মুচলেকা নিয়ে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি ‘ওপরের নির্দেশে’ এমনটি করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন—এমন দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
তবে ওই ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য এবং অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ছাড়া প্রশাসনের কোনো ব্যক্তি অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় বালু উত্তোলনের অভিযোগ:
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনসংলগ্ন বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের ৫২টি ইউনিয়নকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া, মুন্সিগঞ্জ ও কৈখালী ইউনিয়ন এসব এলাকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্টের চারপাশের ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকার বিধান উপেক্ষা করেই বিভিন্ন স্থানে বালু তোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন, আদালতের আদেশ ও সরকারি নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট পরিধি যাচাই করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকা থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে নদীতীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। এর ফলে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ দুর্বল হওয়া, বসতভিটা ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য:
সাতক্ষীরা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রিপন বিশ্বাস বলেন, “সাতক্ষীরা জেলার মধ্যে বর্তমানে কোনো বালুমহলের দাগ নেই। আপনি তথ্য দেন, আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।”
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের ফোন রিসিভ না হওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপে বালুর স্তূপের ছবি ও অবস্থান পাঠানোর পর সম্প্রতি যোগদান করা শ্যামনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর শরীফ নওয়াবেকী এলাকায় গিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা বালু ও বালু উত্তোলনের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন বলে জানা গেছে। এ সময় একজনকে আটক করে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
অভিযান থামলেই আবার শুরু, অভিযোগ স্থানীয়দের:
এলাকাবাসীর দাবি, ওই অভিযানের দিন বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পরদিন থেকে আবারও আগের মতো সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বালু উত্তোলন শুরু হয়। তাঁদের অভিযোগ, বিচ্ছিন্ন অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে বালু উত্তোলনের উৎস, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবি, হাইকোর্টের আদেশ ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নদী, বেড়িবাঁধ ও জনবসতি রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।


















