স্লিপ ফান্ডের অর্থ ব্যয়, পরীক্ষার ফি আদায় ও শ্রেণি পাঠদান নিয়ে প্রশ্ন
(কক্সবাজার ব্যুরো): ক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়া এমআর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চলতি দায়িত্ব শাকের আহমদের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের বরাদ্দের অর্থ ব্যয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি আদায় নিয়মিত শ্রেণি পাঠদান না করা এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই আর্থিক নথিপত্র পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হবে।
স্লিপ ফান্ডের অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন:
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্যে বরাদ্দ করা বিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা (স্লিপ) ফান্ডের অর্থ অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাযথভাবে ব্যয় করা হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, বরাদ্দের বিপরীতে যেসব কাজ বাস্তবায়নের কথা, সেগুলোর বাস্তব অবস্থা এবং ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। তবে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কোন অর্থবছরে কী পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছিল এবং বাস্তবে কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এ-সংক্রান্ত নথি হাতে না পাওয়ায় অর্থ আত্মসাৎ বা অপব্যবহারের অভিযোগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকাশিত স্লিপ নির্দেশিকা অনুযায়ী, এ ধরনের তহবিলের ব্যবহার ও বিদ্যালয় উন্নয়ন পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট নীতিমালার আলোকে যাচাই করা যায়। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের অনুমোদিত পরিকল্পনা, বরাদ্দপত্র, বিল-ভাউচার, ব্যয়ের রেজিস্টার এবং বাস্তবায়িত কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করা জরুরি।
জাতীয় দিবস উদযাপনের বরাদ্দ কোথায় ব্যয় হয়েছে:
অভিযোগকারীদের দাবি, জাতীয় দিবসগুলো উদযাপনের জন্য সরকারি পর্যায় থেকে বরাদ্দ পাওয়া গেলেও বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে দিবসগুলো পালন করা হয় না। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দিবসের জন্য দুই হাজার টাকা বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও সেই অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় দিবস উদযাপনের জন্য কোন কোন তারিখে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে কি না এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট বরাদ্দপত্র ও ব্যয়ের ভাউচার ছাড়া অর্থ ব্যয় করা হয়নি বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
শিক্ষার্থীদের দিয়ে দুপুরের খাবার আনানোর অভিযোগ:
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত দুপুরের খাবার আনানোর অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদেরও তাঁর জন্য খাবার আনতে চাপ দেওয়া হয়। অভিযোগটি সত্য হলে তা শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকের দায়িত্বশীল আচরণ এবং বিদ্যালয়ের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে এ বিষয়ে কোনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের নাম প্রকাশ না করে তাঁদের বক্তব্য নিরাপদে নেওয়া, একাধিক সূত্রের তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং অভিযোগটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনা, নাকি নিয়মিত চর্চা—তা যাচাই করা প্রয়োজন। শিশুদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
নিয়মিত শ্রেণি পাঠদান না করার অভিযোগ:
প্রধান শিক্ষক শাকের আহমদের বিরুদ্ধে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি প্রায়ই পাঠদান থেকে বিরত থাকেন এবং বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজের কথা বলে শ্রেণিকক্ষের বাইরে অবস্থান করেন।
একজন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়; বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম তদারকি, শিক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং প্রযোজ্য দায়িত্ব অনুযায়ী শ্রেণি পাঠদানও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক ক্লাস নেওয়ার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দাবি প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের দৈনিক পাঠদান সূচি, শিক্ষক উপস্থিতি রেজিস্টার, শ্রেণি পর্যবেক্ষণ নথি এবং সহকর্মী ও অভিভাবকদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
অফিসের কাজের কথা বলে বিদ্যালয় ত্যাগের অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে, মাসের শুরুতে উপজেলা শিক্ষা অফিসে প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হলেও শাকের আহমদ প্রায় প্রতিদিনই দাপ্তরিক কাজের কথা বলে দুপুরের পর বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, নিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়?
তবে উপজেলা শিক্ষা অফিসে দাপ্তরিক কাজ, প্রশিক্ষণ, সভা কিংবা অন্য কোনো সরকারি দায়িত্বে যাওয়ার প্রয়োজন থাকতে পারে। তাই এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য বিদ্যালয়ের উপস্থিতি রেজিস্টার, ছুটির তথ্য, দাপ্তরিক আদেশ এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বৈধ দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বাদ দিয়ে কাউকে অনিয়মের জন্য দায়ী করা উচিত নয়।
কন্টিনজেন্সি, পরিচ্ছন্নতা ও ইন্টারনেট ব্যয়ের হিসাব নিয়ে অভিযোগ:
বিদ্যালয়ের কন্টিনজেন্সি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ইন্টারনেট-সংক্রান্ত ব্যয়ের বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, এসব খাতে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়নি এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়া ভাউচারের সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের মিল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ে অর্থবছরভিত্তিক বরাদ্দ, অর্থ ছাড়ের আদেশ, বিল-ভাউচার, সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার, ইন্টারনেট সংযোগের বিল এবং পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যয়ের প্রমাণ সংগ্রহ করা জরুরি। প্রয়োজন হলে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ব্যয়ের নথি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
কোনো ভাউচার ভুয়া বা কোনো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য কেবল অভিযোগ যথেষ্ট নয়; নির্ভরযোগ্য নথি ও তদন্তের ফল প্রয়োজন।
প্রান্তিক মূল্যায়নে পরীক্ষার ফি আদায়ের অভিযোগ:
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রান্তিক মূল্যায়নের সময় পরীক্ষার ফি নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে প্রধান শিক্ষক শাকের আহমদের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে এ অর্থ আদায় করা হয়।
এ ক্ষেত্রে কোন মূল্যায়নের জন্য কত টাকা নেওয়া হয়েছে, অর্থ আদায়ের কোনো রসিদ দেওয়া হয়েছে কি না, টাকা নেওয়ার নির্দেশনা কে দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর সরকারি নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা-সংক্রান্ত মূল্যায়ন নির্দেশনা ও পরীক্ষার ফি বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রাসঙ্গিক পরিপত্র পর্যালোচনা ছাড়া অভিযোগটিকে চূড়ান্তভাবে বিধিবহির্ভূত ঘোষণা করা যাবে না।
অভিযোগটি সত্য হলে বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অভিভাবকদের বক্তব্য ও অর্থ আদায়ের প্রমাণ সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ।
মা ও অভিভাবক সমাবেশ নিয়মিত না হওয়ার অভিযোগ:
বিদ্যালয়ে মা সমাবেশ ও অভিভাবক সমাবেশ নিয়মিত আয়োজন করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের সমাবেশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পড়াশোনার অগ্রগতি, ঝরে পড়ার ঝুঁকি এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করা যায়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সমাবেশের নোটিশ, উপস্থিতি তালিকা, কার্যবিবরণী ও বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা যেতে পারে। সমাবেশ নিয়মিত না হলে তার কারণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ে ঘুমিয়ে থাকার অভিযোগ:
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে কর্মঘণ্টার মধ্যে প্রায়ই ঘুমিয়ে থাকার অভিযোগও করেছেন অভিযোগকারীরা। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তারিখ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বা অন্য কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগটি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
অভিযোগটি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ, একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং বিদ্যালয়ের কর্মপরিবেশ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অনুমান বা শোনা কথার ভিত্তিতে কারও পেশাগত আচরণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা উচিত নয়।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি:
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। সে কারণে বিদ্যালয়ের বরাদ্দের অর্থ, শ্রেণি পাঠদান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির বক্তব্য নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আর্থিক নথি ও বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
শিক্ষার্থীদের স্বার্থে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা এবং বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রধান শিক্ষক শাকের আহমদের বক্তব্য: এ প্রতিবেদনের জন্য তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
অপরাধচিত্রের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।


















