মাছ ধরার ট্রলার সাগরে নামতেই বাড়ছে পাচারের তৎপরতা টার্গেটে স্থানীয় যুবক কিশোর ও রোহিঙ্গা নারী পাহাড়ে আটকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ
প্রতিবেদন: আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ হুবাইব, টেকনাফ প্রতিনিধি
সাগরে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হতেই কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানবপাচার চক্র। মাছ ধরার ট্রলার সাগরে নামার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পুরোনো রুটে নতুন করে পাচারের তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি। চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভনে স্থানীয় যুবক-কিশোরদের পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় স্বামী বা স্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদেরও টার্গেট করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উপকূলের কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে ছোট নৌকায় করে লোকজনকে সাগরের মাঝখানে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলারে তোলা হয়। এরপর তাঁদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা চলে। কোথাও বিদেশে যাওয়ার প্রলোভন, কোথাও পাহাড়ে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার এক দালালের হাত থেকে অন্য দালালের হাতে ভুক্তভোগীদের তুলে দেওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চার যুবককে পাহাড়ে আটকে রেখে পাঁচ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ এবং রামুর আট যুবকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উপকূলজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও মানবপাচার প্রতিরোধে নজরদারি ও অভিযান জোরদারের কথা জানিয়েছে।
পাহাড়ে আটকে চার যুবক, মুক্তিপণ পাঁচ লাখ টাকা
মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ওয়াব্রাং এলাকার চার যুবক। তাঁদের একজন হেলাল উদ্দিনের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কীভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তাঁদের পাহাড়ের ভেতরে আটকে রাখা হয় এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
হেলাল উদ্দিন জানান, গত ১ অক্টোবর তাঁরা চার বন্ধু গোপনে বাড়ি থেকে বের হন মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে। একই এলাকার আট মাস আগে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়া রাসেল, পিতা দিল মুহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
রাসেল তাঁদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, মালামালবোঝাই একটি জাহাজে করে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে। সেখানে তাঁদের চারজন ছাড়া অন্য কোনো যাত্রী থাকবে না এবং নিরাপদেই গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল।
রাসেলের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী তাঁরা হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়া নয়াপাড়ার একটি বাড়িতে যান। হেলালের ভাষ্য, সেখানে পৌঁছানোর পর কয়েকজন তাঁদের গভীর পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে আটকে রাখে। চক্রের সদস্যরা জানায়, সাগরে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ট্রলারে করে তাঁদের পাঠানো সম্ভব হয়নি। নিষেধাজ্ঞা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়েই থাকতে হবে।
এরপর হেলালের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। চারজনকে ছাড়িয়ে নিতে টাকা দাবি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা তাঁদের বিদেশে না পাঠিয়ে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় হেলালের মামা জাফর ইকবাল মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রাসেল ও তাঁর খালাতো ভাই তারেকের মাধ্যমে প্রথমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ৪০ হাজার টাকা পাঠান। পরে চারজনকে মুক্তি দেওয়ার জন্য পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
হেলালের দাবি, ছেলেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পরিবারের সদস্যরা পাঁচ লাখ টাকা দেন। টাকা দেওয়ার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হলে বাড়ি ফেরার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করেন।
যৌথ অভিযানে চার যুবক উদ্ধার, আটক তারেক
১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও টেকনাফ থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে চার যুবককে উদ্ধারের পাশাপাশি অপহরণকারী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে মো. তারেক (২৩) নামে একজনকে আটক করা হয়।
১৬ এপিবিএন সূত্রে জানা যায়, ৬ অক্টোবর দুপুর আনুমানিক ২টা ১০ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের চেকপোস্টসংলগ্ন মৌসুমী গেটের বাম পাশে মাছবাজার এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
উদ্ধার হওয়া চার যুবক হলেন—হেলাল উদ্দিন (২১), মো. ইউনুস (২১), জসিম উদ্দিন (২১) ও খায়রুল আমিন (২১)। আটক তারেক হ্নীলা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দুদু মিয়ার ছেলে।
অভিযান শেষে উদ্ধার হওয়া চারজন ও আটক তারেককে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন রাত ৮টা ২০ মিনিটে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ১৬ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি কাউছার সিকদার।

মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে নিখোঁজ রামুর আট যুবক
এদিকে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছেন কক্সবাজারের রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের আট যুবক। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁরা গোপনে বাড়ি থেকে বের হয়ে টেকনাফের উদ্দেশে রওনা দেন। এরপর থেকে তাঁদের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।
নিখোঁজ আটজন হলেন—মেহেদী হাসান, গিয়াস উদ্দিন, করিম, মোবারক, করিম, নবী আলম, রিফাত ও হুয়ায়ন কবির। তাঁরা সবাই রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের দোছড়ি এলাকার বাসিন্দা।
নিখোঁজ মেহেদী হাসানের ভাই সালামত উল্লাহ জানান, তাঁর ভাইসহ আটজন কাউকে কিছু না জানিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে টেকনাফের দিকে রওনা হয়েছিলেন। কার মাধ্যমে বা কোন দালালের সহযোগিতায় তাঁরা যাত্রা করেছিলেন, তা তিনি জানেন না। বাড়ি ছাড়ার পর থেকে তাঁদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
তাঁদের সাগরপথে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বজনেরা। তবে আট যুবকের বর্তমান অবস্থান কিংবা তাঁরা মানবপাচারের শিকার হয়েছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিষেধাজ্ঞা শেষে ট্রলার চলাচল, পুরোনো রুটে নতুন তৎপরতা
সাগরে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এ সময় মাছ ধরার ট্রলারগুলো সাগরে যেতে পারেনি। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর ট্রলার চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করলে মানবপাচারকারীরাও নতুন করে তৎপর হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া, সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ ও কাটাবনিয়া এলাকার কয়েকটি উপকূলীয় পথ ব্যবহার করছে পাচারকারী চক্র। প্রথমে স্থানীয় যুবক-কিশোরদের বিদেশে ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখানো হয়। তিন থেকে চার লাখ টাকায় মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে পরিবারের কাছে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অজান্তেই যুবকদের বাড়ি থেকে বের করে নির্দিষ্ট স্থানে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের ছোট নৌকায় তুলে সাগরের মাঝখানে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলারে পৌঁছে দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
এক দালালের হাত থেকে অন্য দালালের হাতে ভুক্তভোগীরা
স্থানীয় রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীরাও পাচারকারীদের টার্গেটে
মানবপাচার চক্রের লক্ষ্য শুধু স্থানীয় যুবক-কিশোরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীরাও এই চক্রের টার্গেটে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত স্বামী কিংবা স্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে রোহিঙ্গা নারীদের প্রলুব্ধ করা হয়। কোথাও বিয়ের প্রলোভন, কোথাও উন্নত জীবনের আশ্বাস দিয়ে তাঁদের সাগরপথে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ধরনের পাচারের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, সম্মতি এবং প্রকৃত গন্তব্য সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের কাছে অনেক সময় স্পষ্ট তথ্য থাকে না। ফলে সাগরপথে যাত্রার পর তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
কচ্ছপিয়া এলাকায় চক্রের নেতৃত্ব ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ে কয়েকজনের নাম
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দেওয়া তথ্য ও অনুসন্ধানে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া এলাকার মানবপাচার নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব, সমন্বয় ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, পঙ্গু সৈয়দুল হক, পিতা কবির আহমদ, চক্রটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্তমানে আড়ালে থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাঁর সৎভাই ফারুক (২৬), পিতা আলী আহমদ, কার্যক্রম পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সৈয়দুল হক ও ফারুকের মা ফাতেমা খাতুন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কচ্ছপিয়া উপকূল থেকে সাগরের মাঝখানে অপেক্ষমাণ ট্রলারে লোকজন পৌঁছে দিতে ছোট নৌকা ব্যবহার করা হয়। এ কাজে আব্দুর রহিম (৩০), পিতা শামসুর, যুক্ত রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। নৌকার মাঝি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নৌকার মালিকের আপন ভাই ছলিম।
অন্যদিকে ছোট নৌকা ও সাগরে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলারের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে আমির হোসেন প্রকাশ পেটান আলী (৩০), পিতা জাগির হোসেন, রয়েছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাঁদের দাবি, সাগরে ট্রলারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা মূলত পেটান আলীকেই চেনেন এবং তাঁর মাধ্যমেই ছোট নৌকা থেকে যাত্রীদের ট্রলারে তোলা হয়।
উল্লিখিত ব্যক্তিরা বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া এলাকার বাসিন্দা বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।
২৫ অক্টোবরের অভিযানে দুই সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার
মানবপাচার প্রতিরোধে গত ২৫ অক্টোবর টেকনাফে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো। অভিযানে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে লেদা ২৪ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ কবির ওরফে ডা. কবির (৬৫) এবং মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে ইলিয়াস মেম্বারকে (৪২) গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁরা ২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাবোঝাই মালয়েশিয়াগামী একটি নৌযান আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবপাচার নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন। তবে এ বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল কিংবা আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া তাঁদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।
১৬ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ কাওছার সিকদারের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা অংশ নেন। একই অভিযানে হত্যা ও অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি আবু তৈয়বকেও (৩৬) গ্রেপ্তার করা হয়।
পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে ছয় মাস, একজনকে পাঁচ মাস এবং দুজনকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য চারজনকে ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়।
ট্রলারের ফ্রিজিং কক্ষে গাদাগাদি করে মানুষ, খাবার-পানির সংকট
সাগরপথে মানবপাচারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হাবিব উল্লাহ (৪৭)। ২০১৭ সালে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়া এই ব্যক্তি ২০২২ সালে দেশে ফিরে আসেন। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে, কীভাবে মাছ ধরার ট্রলারের ফ্রিজিং কক্ষে মানুষকে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হতো।
হাবিব উল্লাহ জানান, মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ট্রলারের ভেতরে মাছ রাখার ফ্রিজিং কক্ষে তাঁদের গাদাগাদি করে রাখা হতো। কক্ষের ওপরের ঢাকনা বন্ধ করে দেওয়া হতো। প্রতিদিন অল্প পরিমাণ খাবার ও পানি দেওয়া হতো, যা দিয়ে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা কোনোটিই মিটত না।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্রিজিং কক্ষের ভেতরে তীব্র গরম, পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কেউ বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করলে ট্রলারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা মারধর করতেন।
হাবিব উল্লাহ আরও জানান, তাঁদের ট্রলারে থাকা একজন ব্যক্তি নির্যাতন ও কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সাগরে ঝাঁপ দেন। এরপর তাঁরা পানিতে রক্তের চিহ্ন দেখতে পান, কিন্তু ওই ব্যক্তির আর কোনো খোঁজ পাননি। অন্য এক ব্যক্তি সাগরে ঝাঁপ দিলে ট্রলারের লোকজন তাঁকে তুলে আনে। পরে তাঁকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয় এবং একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে দাবি করেন হাবিব উল্লাহ।
তাঁর এই অভিজ্ঞতা সাগরপথে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রার নামে মানুষকে কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়, তার একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি: প্রায় ২৫০ জনের নিখোঁজ বা মৃত্যুর আশঙ্কা
টেকনাফ উপকূলকে কেন্দ্র করে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের ভয়াবহ পরিণতির নজির দেখা গেছে চলতি বছরের এপ্রিলে। ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা যাত্রীবোঝাই একটি ট্রলারডুবির পর মাত্র নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারটিতে প্রায় ২৫০ জন যাত্রী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। দুর্ঘটনার পর বিপুলসংখ্যক যাত্রী নিখোঁজ কিংবা নিহত হয়েছেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনা অনুযায়ী, ট্রলারটিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়েছিল। উত্তাল সাগর ও প্রবল বাতাসের মধ্যে নৌযানটি ডুবে যায়। কয়েকজন বেঁচে ফেরা যাত্রী জানিয়েছেন, যাত্রাপথে ট্রলারের ভেতরে গাদাগাদি করে রাখা যাত্রীদের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছিল।
বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইডের নাবিকেরা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি সাগর থেকে ভাসমান অবস্থায় নয়জনকে উদ্ধার করেন। পরে তাঁদের বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি ও তিনজন রোহিঙ্গা ছিলেন।
ঘটনার পর মানবপাচারের অভিযোগে ছয় বাংলাদেশিকে আসামি করে টেকনাফ থানায় মামলা করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রলারটিতে যাত্রী তোলা ও পাচার কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়। তবে নিখোঁজ যাত্রীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
আগেও ট্রলারডুবি, উদ্ধার হয়েছেন বহু মানুষ
টেকনাফ উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী নৌযান থেকে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নৌযানডুবি এবং সাগরে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনাও ঘটেছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর বাহারছড়ার নোয়াখালীয়াপাড়া এলাকা থেকে ১৮ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন বাংলাদেশি ও দুজন রোহিঙ্গা ছিলেন। একই মাসের ২৫ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ লম্বরী এলাকা থেকে আরও ১৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনা টেকনাফ উপকূলকে কেন্দ্র করে মানবপাচারের ঝুঁকি ও তৎপরতার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।
মানবপাচার ঠেকাতে কঠোর সতর্ক পুলিশ, রাতে যৌথ অভিযান
নিষেধাজ্ঞা শেষে টেকনাফ উপকূলে মানবপাচার চক্রের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার কথা জানিয়েছেন টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি সাইফুল ইসলাম
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে মানবপাচার চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে—এমন তথ্য তাঁদের কাছে এসেছে। এ বিষয়ে পুলিশ কঠোর সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ওসি জানান, গত ৩১ অক্টোবর রাতেও এসআরবি, পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যদের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি ও পাহারা দেওয়া হয়েছে, যাতে মানবপাচারকারীরা কোনোভাবেই তৎপরতা চালাতে না পারে।
তিনি আরও জানান, মানবপাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নজরদারির পাশাপাশি চক্রের অর্থদাতা ও নেপথ্যের হোতাদের শনাক্তের দাবি
স্থানীয়দের মতে, মাছ ধরার ট্রলার চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেকনাফের উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া, সাবরাংয়ের শাহপরীর দ্বীপ ও কাটাবনিয়া এলাকার নৌঘাট, ছোট নৌকা এবং সাগরে চলাচলকারী ট্রলারের ওপর নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
তাঁদের দাবি, শুধু মাঠপর্যায়ের দালালদের আটক করলেই মানবপাচার বন্ধ হবে না। এর পেছনে থাকা অর্থদাতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষাকারী, নৌযান সরবরাহকারী এবং সাগরে অপেক্ষমাণ ট্রলারের নিয়ন্ত্রণকারীদের শনাক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, নিখোঁজদের সন্ধান এবং তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে টেকনাফ উপকূলে মাছ ধরার ট্রলার যেমন আবার সাগরে ফিরেছে, তেমনি মানবপাচার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। পাহাড়ে আটকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ, চার যুবকের উদ্ধার, রামুর আট যুবকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এবং অতীতের ভয়াবহ ট্রলারডুবির স্মৃতি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—সাগরপথে মানবপাচারের পুরোনো নেটওয়ার্ক কি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে?
জীবিকার সন্ধানে কিংবা উন্নত জীবনের আশায় কেউ যেন আর সাগরের অতল অন্ধকারে হারিয়ে না যান, সে জন্য উপকূলজুড়ে কার্যকর নজরদারি ও মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান এখন সময়ের দাবি।

















