অপরাধচিত্র ডেস্ক: নতুন করে মার্কিন-ইরান সংঘাত এবং লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বিশ্ববাজারে ফের অস্থিরতা শুরু হয়েছে। জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ায় ব্যারেল প্রতি দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম বেড়ে ১০২ ডলারে পৌঁছায় এবং দিনের শেষে তা ১০০ দশমিক ৬৯ ডলারে স্থির হয়। মে মাসের পর এটিই ব্রেন্ট তেলের সর্বোচ্চ দাম। ২৫ জুলাই শুক্রবার দাম কিছুটা কমলেও গত সপ্তাহের তুলনায় তা ১২ শতাংশ এবং গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি রয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। এই দুটি রুট দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক চতুর্থাংশ যাতায়াত করে। হরমুজ প্রণালীতে ট্রাফিক প্রায় বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে তেলের ট্যাংকারগুলোতে হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ তৈরি করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রেড সাগরের হামলার জন্য ইরান এবং হুথিদের কঠোর সামরিক শাস্তির হুশিয়ারি দিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোল্ডেন স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে যে, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার ছাড়াতে পারে। অন্যদিকে জেপি মরগানের হিসাব অনুযায়ী, সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রতিটি অতিরিক্ত মাসের জন্য ব্রেন্টের দাম ৭ থেকে ৮ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর আগে গত এপ্রিলে সংঘাতের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল। তবে সে যাত্রায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কৌশলগত তেলের মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড় করায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ওই সময় মার্চ মাসে একক সিদ্ধান্তে আইইএর ৩২টি সদস্য দেশ ৪০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়ার অনুমোদন দিয়েছিল। যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছেড়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বস্তির সুযোগ বেশ সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১১ মিলিয়নে, যা ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মজুত আরও কমলে সংকটের সময় জরুরি ভিত্তিতে তেল সরবরাহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। বাণিজ্যিক মজুত ও ভাসমান গুদামগুলোর অবস্থাও বেশ করুণ, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক প্রকার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এদিকে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি বা রিফাইনিং মার্জিনও রেকর্ড গড়েছে। মার্কিন ৩-২-১ ক্র্যাক স্প্রেড প্রায় ৭০ ডলারে পৌঁছেছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। ইউরোপীয় বাজারে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি সীমিত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম হু হু করে বাড়ায় কৃষি ও পরিবহন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এই সংকটের মধ্যে রাশিয়ার অর্থনীতি ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার উরাল ক্রুডের রপ্তানি মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির বাজেটে বড় ধরনের রাজস্ব যোগ করছে। ভারত ও চীন রেকর্ড পরিমাণ রুশ তেল কেনা অব্যাহত রাখায় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মস্কো ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে বিশ্ব অর্থনীতির বড় অংশজুড়ে জ্বালানি সংকটের এই কালো মেঘ যেকোনো সময় আরও বড় বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।