অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান
১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বেগম খালেদা খানম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ৫ বছর পর ১৯৬৫ সালে স্বামীর পশ্চিম পাকিস্তানে পোস্টিং হলে খালেদা জিয়া স্বামীর সঙ্গে সেখানে চলে যান। কিছুদিনের মধ্যেই পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়। জিয়াউর রহমান ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়ন ‘আলফা কোম্পানির’ কমান্ডার হিসেবে ‘খেমকারন’ রণাঙ্গনে বেদিয়ান-এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধে বীরত্বের জন্য মেজর জিয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেতাবও অর্জন করেন। সংসার জীবনের সাধারণ হিসাব-নিকাশের বাইরে পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবিচল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া নিজে দেশের প্রয়োজনে জনগণের কল্যাণে ব্যক্তিগত জীবনের সুখ শান্তি বিসর্জন দেওয়ার পালা প্রথমবারের মতো এরই মাধ্যমে শুরু করেন।
১৯৬৯ সালে স্বামী মেজর জিয়ার পোস্টিং-এর সুবাদে তিনি ঢাকায় ফিরে এলেন। অষ্টম ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়া মেজর জিয়ার গতিবিধির ওপর বিশেষ নজর রাখছিলেন। মেজর জিয়া ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে ষোলো শহর ক্যান্টনমেন্টের অন্যসব অফিসারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যাপ্টেন অলির সঙ্গে পরামর্শ করে পাকিস্তানিদের রুখে দাঁড়ানোর দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ থেকে জিয়া পরিকল্পনার ইঙ্গিত পান। ১৭ মার্চ মেজর জিয়া ক্যাপ্টেন আলি ও মেজর আমিন আহমেদকে নিয়ে পুনরায় গোপন সভায় মিলিত হন। পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলো। কর্নেল এম আর চৌধুরীকে অনুরোধ করা হলো বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের প্রশাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক রদবদল ঘটে। শুরু হয় ২৫ মার্চের কালরাত। কর্নেল জানজুয়া মেজর জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার নির্দেশ দিয়ে নৌবাহিনীর একটি ট্রাকে করে বন্দরে পাঠান। জিয়া পরিস্থিতি অনুধাবন করে আগ্রাবাদের একটি ব্যারিকেডে গাড়ি থামালে নেমে যান এবং কিছু সময়ের মধ্যেই ঘোষণা দিলেন ‘উই রিভোল্ট’।
নৌবাহিনীর ট্রাকে তার সঙ্গী পশ্চিমা সামরিক অফিসার ও নৌ-সেনাদের অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করে তাদের গ্রেপ্তার করেন। একই সঙ্গে কর্নেল জানজুয়ার বাড়িতে গিয়ে ঘুম থেকে তুলে তাকে গ্রেপ্তার করলেন। এভাবে শুরু হলো পাক-ভারত যুদ্ধে বীরত্বের জন্য খেতাবধারী বীর যোদ্ধা মেজর জিয়ার বাংলাদেশ অধ্যায়।
বেগম খালেদা জিয়া ও দুই শিশুসন্তানকে চট্টগ্রামে অরক্ষিত অবস্থায় রেখেই মেজর জিয়া স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এভাবে পুনরায় শুরু হলো বীর যোদ্ধা মেজর জিয়ার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। মেজর জিয়া মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ায় বেগম খালেদা জিয়া দুই শিশুপুত্র নিয়ে চট্টগ্রামে চাচার বাসায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। শুরুর দিকে কিছুদিন যোগাযোগ থাকলেও এক পর্যায়ে তারা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। চট্টগ্রামে চাচার বাসায় আত্মগোপনে থাকা খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তানের জন্য নিরাপদ ছিল না বিধায় বড় বোন খুরশিদ জাহান তাদের ঢাকায় তার বাসায় নিয়ে আসেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুই অবুঝ শিশুকে বুকে আগলে ধরে ছদ্মবেশে নৌপথে নারায়ণগঞ্জ হয়ে বেগম জিয়া ঢাকায় আসেন। ২৬ মে ১৯৭১ সালে অর্থাৎ ঢাকায় আসার ১০ দিনের মাথায় পাক সেনারা খালেদা জিয়ার অবস্থান কোথায় তা জেনে যায়। দুই শিশুসন্তান নিয়ে পরে শংকরে মামার বাসায় এবং নিরাপত্তার অভাবে সেখান থেকে পরে বেগম খালেদা জিয়ার দিনাজপুরের এক প্রতিবেশীর আত্মীয়ের ঢাকার বাসায় গিয়ে আত্মগোপন করেন। পাক সেনারা তাকে খুঁজে পেয়ে যায় ২ জুলাই ১৯৭১-এ এবং সেই দিনই গ্রেপ্তার করে চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে আর্মি অফিসার্স মেসে নিয়ে যায়। চরম নিরাপত্তাহীনতায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট একটি কামরায় দুই শিশুসন্তান নিয়ে দেশমাতৃকা স্বাধীন হবে এই আশায় নির্ঘুম প্রহর গুনতে থাকেন বেগম জিয়া। একদিন বোমা বিস্ফোরণে, যে কক্ষে তারা বাস করতেন তার এক অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে যান। প্রায় ছয় মাস দুই সন্তানসহ বন্দি অবস্থায় কাটান। শ্বাসরুদ্ধকর এই অবস্থার অবসান হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে, লাখো মা বোনের ইজ্জত ও শহীদের রক্তের বিনিময়ে যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই আনন্দের মধ্যেও যে দুশ্চিন্তা খালেদা জিয়াকে গ্রাস করে রেখেছিল, তাহলে মেজর জিয়া কি বেঁচে আছেন? বিজয় অর্জনের পর প্রায় তিন সপ্তাহ গত হয়ে গেল; কিন্তু মেজর জিয়ার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
অবশেষে প্রায় ২৫ দিন পর আতঙ্কে দিশেহারা বেগম জিয়া ও দুই অবুঝ সন্তানের কাছে ফিরে এলেন জেড ফোর্সের অধিনায়ক স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করার পর মেজর জিয়া তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করার জন্য ব্যারাকে ফিরে যান। বেগম জিয়া স্বামীর সঙ্গে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত একজন বীর সৈনিকের যোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর বেগম জিয়ার জীবনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। কিন্তু তিনি একজন প্রেসিডেন্টপত্নী হিসেবে সরল জীবন যাপন করতেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চক্রান্তকারীদের হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনাকাঙ্ক্ষিত শাহাদত বরণের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ ২১ বছরের মধুর দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। দিশাহীন জাতিকে যিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় নিয়ে এসেছিলেন, হঠাৎ তার এ দুঃখজনক শাহাদাতবরণ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। দেশ ও জাতির এই সংকটময় মুহূর্তে কোনো পূর্বপরিকল্পনা না থাকা সত্ত্বেও এভাবেই সংসারের করিডোর অতিক্রম করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম জিয়ার আবির্ভাব ঘটে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি দলের প্রাথমিক সদস্য হওয়ার মাধ্যমে। ১৯৮২ সালে ২১ জানুয়ারিতে কে বিএনপির চেয়ারম্যান হবে, সেই বিষয় নিয়ে দলে সংকট তৈরি হয়। নতুন নেতৃত্ব বেগম জিয়াকে সমর্থন করল। একটি অংশ প্রধান বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের পক্ষে সমর্থন দেয়। দলে যেন বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা না হয় সেজন্য বেগম জিয়া বিচারপতি সাত্তারকে সমর্থন করে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে নির্বাচনের মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসন হন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের শুরুর দিক থেকে দীর্ঘ নয় বছর জগদ্দল পাথরের মতো ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন জেনারেল এরশাদ। এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন রচনা করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব অর্জন করেন।
বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এরশাদের সামরিক শাসন জারি, নির্বাচিত পার্লামেন্ট বাতিল করা, জাতীয় সংবিধান স্থগিত করা, রাজনৈতিক সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ও হত্যা (১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতা জয়নাল, জাফর, দিপালী সাহাকে হত্যা করে এরশাদ বাহিনী) করার ফলে দেশে এক চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর অভ্যুত্থান এবং প্রতি-অভ্যুত্থানের এর ফলে দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় সেই ক্রান্তিলগ্নে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশে হাল ধরতে হয়েছিল। অনুরূপভাবে বেগম খালেদা জিয়া সামরিক জান্তা এরশাদের জুলুম-নির্যাতনের জাঁতাকলে পিষ্ট জাতির আরেক ক্রান্তিলগ্নে জনগণের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।

দলের ভেতরের ষড়যন্ত্র (অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের নায়ক ছিল এরশাদের সঙ্গে গোপনে আঁতাতকারী ‘হুদা-মতিন’ চক্র) ও দলের বাইরের ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে বেগম জিয়া ৭ দলীয় ঐক্যজোট তৈরি করেন। ১৯৮৩ সালের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১৫ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ৫ দফা ঘোষণা দেন। ১৯৮৫ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ বিএনপির মধ্যে আরেক দফা ভাঙনের অপচেষ্টা চালায়। ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বেগম জিয়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দলকে আরও শক্তিশালী করেন। ১৯৮৬ সালে সামরিক জান্তা এরশাদ তার দুঃশাসনকে বৈধতা দেওয়ার এক দুরভিসন্ধিমূলক কূটচালের অংশ হিসেবে সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলে ৭ দল ও ১৫ দল যৌথভাবে এই ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু ধূর্ত সামরিক জান্তা এরশাদের ফাঁদে পা দিয়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে অংশ নেন।
এ সময় নেতৃত্বের অসাধারণ দক্ষতা ও আপসহীন মনোভাব প্রদর্শন করে বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচারী এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের নেতৃত্বের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন। হরতাল, সচিবালয় ঘেরাও ও আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাসে আহত হন। কোনো নির্যাতন তাকে রুখতে পারেনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেতাকর্মীদের সাহস ও অনুপ্রেরণার মধ্যমণি হয়ে সব বাধা অতিক্রম করে স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা এরশাদের কবল থেকে ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বরে দেশবাসীকে মুক্ত করেছেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী এরশাদের পতনে এই আত্মবিশ্বাসী লড়াকু ছাত্রদের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের ভূমিকাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৯৯১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে শহীদ জিয়ার আদর্শে উজ্জীবিত, খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রতিদানস্বরূপ বিএনপি বিজয় অর্জন করে। বিএনপির ঘোর সমালোচকরাও খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ শাসন আমল নিয়ে প্রশংসা করে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখার স্বার্থে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি নির্বাচনে যায় এবং ১১৬ আসন পেয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশের জনগণ কেমন ছিল, তা ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয় অর্জন করে। বেগম জিয়ার বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভূমিকা পালন এবং আওয়ামী দুঃশাসনের দুঃসহ যন্ত্রণা এই বিজয়ের পেছনে মূল নিয়ামক ছিল। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি কিছু সেনা কর্মকর্তাসহ সেনাপ্রধান মঈনউদ্দিন ক্ষমতা দখল করে এবং ২২ জানুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বাতিল করে। ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বে অসাংবিধানিকভাবে সেনা সমর্থিত এক সরকার প্রতিষ্ঠা করে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবার এবং বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবর্গের বিরুদ্ধে কল্পকাহিনি প্রচার শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় যৌথবাহিনী গঠন করে ২০০৭ সালে ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে এবং ১৬ এপ্রিল আরাফাত রহমানকে গ্রেপ্তার করে। বেগম খালেদা জিয়াকে সন্তান, নেতাকর্মীসহ সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭-এ কারাবন্দি করা হয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে ঘুষ গ্রহণের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। আমরা সবাই অবগত আছি যে, এটি মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন গং-এর ‘মাইনাস-টু-ফরমুলা’ বাস্তবায়নের একটি অপকৌশল ছিল।

বেগম খালেদা জিয়া আবারও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রজ্ঞাবান নেত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। দলের সুবিধাবাদী নেতৃবৃন্দ, যারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তাদের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দলীয় পদ থেকে বরখাস্ত এবং দল থেকে বহিষ্কার করে দুঃসময়ে দলকে রক্ষা করেন। প্রবল জনমতের কারণে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ তারিখে বেগম খালেদা জিয়াকে সেনাসমর্থিত সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্ত হয়ে খালেদা জিয়া অসাংবিধানিক সরকারের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করেন। চাপের মুখে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থা বহাল রেখে নির্বাচন দেওয়ার প্রস্তাব করলে বেগম খালেদা জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনর্বহাল করার স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়া মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সেনা সমর্থিত সরকারের অধীনে জরুরি অবস্থার মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে রাজি হননি। পরবর্তী সময় জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হলে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং নানামুখী ষড়যন্ত্রের মুখে পরাজয় বরণ করে।
নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর যা ঘটে যাচ্ছে তা সবার জানা। ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। এ দীর্ঘ সময়ে বেগম জিয়াকে বাড়িছাড়া করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বর্তমান সরকার তাকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। সেখানেও রেহাই নেই, শারীরিকভাবে অসুস্থ বেগম জিয়াকে চিকিৎসার সুবিধাটুকু দেওয়া হয়নি। যে মিথ্যা মামলায় তিনি সাজাভোগ করছেন, সেই মামলায় তিনি জামিন পেলেও নানা অজুহাতে এবং একটির পর আরেকটি মিথ্যা মামলার কার্যক্রম চালু করে কারাগার থেকে বের হতে বাধা প্রদান করছে; জোরপূর্বক কারাগারে আটকে রেখেছে। এর কারণ একটাই, তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চান, যা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূলমন্ত্র।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের মিথ্যে ও সাজানো মামলায় ৫ বছরের কারাভোগ করেছেন বেগম খালেদা জিয়া।
অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই-এ খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামী চরিত্র নেতাকর্মীদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে ৯০-এর দশকেই। দেশবাসীও বেগম খালেদা জিয়াকে ভালোবাসে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অসংখ্য নেতাকর্মী যখন ‘আমার নেত্রী আমার মা, জেলে যেতে দেব না’ এমন গগনবিদারী স্লোগান দেন, তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে এভাবে নেত্রীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করা নেতাকর্মীদের অতি আবেগের বহিঃপ্রকাশ নাকি এর পেছনে কোনো বাস্তবতা বা যুক্তি রয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়া যখন বেগম খালেদা জিয়া ও দুই শিশুসন্তানকে রেখে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন বেগম খালেদা জিয়া পরম মমতায় তার দুই শিশুসন্তানকে দীর্ঘ ৯ মাস কখনো আত্মগোপন, কখনো বন্দিদশায় থেকে যেভাবে আগলে রেখেছেন, তা কেবল গর্ভধারিণী হলেই হয় না—তার জন্য প্রয়োজন সেরকম একজন মা, যিনি শুধু জন্ম দেন না; বরং জীবনের সবটুকু দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন। খালেদা জিয়া সেই অর্থে একজন আদর্শ গর্ভধারিণী; তিনি তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানের মা।
দীর্ঘ বিরতির পর গণতন্ত্রহীনতার অবসান ঘটেছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তা খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের এক অনন্য কাঙ্ক্ষিত অর্জন। গণতান্ত্রিকভাবে অভ্যুত্থান-উত্তর নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হলো গণতন্ত্রের এই ধারা চলমান রাখা এবং ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অবিচল থাকা। এই সংগ্রামে বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে এটাই হোক সবার অঙ্গীকার।
লেখক: উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


















