বিশেষ প্রতিবেদক, বরিশাল: আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) আমানতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উদ্ধারকৃত চোরাই মালামাল বিক্রি এবং আটক ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাকেরগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে চুরি হওয়া বিপুল পরিমাণ তামার তার ও লোহার মালামাল উদ্ধার করার পর তা জব্দ তালিকাভুক্ত না করে স্থানীয় এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা হলেন, আমানতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. কবির হোসেন এবং সহকারী ট্রাফিক উপপরিদর্শক (এটিএসআই) মো. জাকির হোসেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৬ জুন দুপুরে বাকেরগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘হ্যাভেন কনস্ট্রাকশন’ এলাকা থেকে চুরি হওয়া মালামাল বহনকারী একটি মোটরচালিত ভ্যান নগরীর হাটখোলা মরিচপট্টি এলাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. আবুল শিকদারের গোডাউনে পৌঁছায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তা ভ্যানসহ দুই ব্যক্তিকে আটক করেন। ভ্যানে তিনটি সিমেন্টের বস্তা ও দুটি কার্টনে সংরক্ষিত প্রায় ১৮৫ কেজি তামার তার এবং ৫০ কেজি লোহার গর্দা ছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
তবে অভিযোগ রয়েছে, আটক ব্যক্তিদের থানায় বা ফারিতে নিয়ে মামলা না করে ঘটনাস্থলেই দীর্ঘ সময় ধরে দরকষাকষি চলে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় চার ঘণ্টা আলোচনা শেষে প্রতি কেজি তামা ১ হাজার ৬১০ টাকা দরে এবং লোহার গর্দা ৪৫ টাকা কেজি দরে মোট প্রায় ৩ লাখ ১০০ টাকায় মালামাল স্থানীয় ভাঙারি ব্যবসায়ী আবুল শিকদারের কাছে বিক্রি করা হয়। অর্থ লেনদেনের পর আটক ব্যক্তিদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, সমঝোতার পুরো প্রক্রিয়ায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. আবুল শিকদার সাংবাদিকদের বলেন, তিনি তামা কিনেছেন। তবে কত কেজি তামা কিনেছেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আমি ৫০ কেজি লোহার গর্দা কিনেছি। মালামাল বিক্রির সময় এএসআই কবির ও এটিএসআই জাকির উপস্থিত ছিলেন। পরে তারা টাকা নিয়ে কী করেছেন, তা আমার জানা নেই।”
স্থানীয় ভাঙারি ব্যবসায়ী রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আবুল শিকদার দীর্ঘদিন ধরে চোরাই মালামাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। তাঁর দাবি, “লাভজনক হওয়ায় ওই মালামাল কম দামে কেনা হয়েছিল। এএসআই কবির ও এটিএসআই জাকির প্রায়ই সিভিল পোশাকে ঘুরে চোরাই মালামাল উদ্ধার করে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে টাকার বিনিময়ে রফাদফা করেন।”
হাটখোলা এলাকার ব্যবসায়ী হেমায়েত হোসেন বলেন, ঘটনার দিন পুলিশ চোরাই মালামাল নিয়ে নানা তৎপরতা চালায়। পরে তিনি জানতে পারেন, মালামাল ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা জানাতে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে আমানতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (এসআই) কুদ্দুস বলেন, “মালামাল জব্দ করার পর যাদের মালামাল তারা নিয়ে গেছে। পরে কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই।”
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। স্থানীয়দের দাবি, গত ২৯ মার্চও চোরাই তামার তার উদ্ধার করে মামলা না দিয়ে অর্থের বিনিময়ে রফাদফা করা হয়। এছাড়া এলাকায় মাদক কারবারিদের সঙ্গে তাদের অনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন কয়েকজন বাসিন্দা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা পাবে।
এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনারের মোঃ আব্দুল হান্নানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।


















