অপরাধচিত্র রিপোর্ট: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সহিংস পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশ সদরদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার করা গেলেও এখনো ১ হাজার ৩০৬টি অস্ত্রের হদিস মেলেনি।
অস্ত্র উদ্ধারে একাধিকবার অভিযান ও পুরস্কার ঘোষণার পরও বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র বাইরে থেকে যাওয়ায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অস্ত্র কোথায় রয়েছে, কার হাতে ঘুরছে কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কতটা ব্যবহৃত হয়েছে—এ নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
সম্প্রতি লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নকে (এসআরবি)। একই সঙ্গে অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার পাশাপাশি সরকারি নিয়মে পুরস্কার দেওয়ার কথাও জানিয়েছে বাহিনীটি।
অপরাধে ব্যবহারের প্রমাণ মিলছে:
লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ যে পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের হাতে পৌঁছেছে, বিভিন্ন ঘটনায় তার প্রমাণ মিলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে, কিছু অস্ত্র হাতবদল হয়ে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ডাকাতি, আধিপত্য বিস্তার এবং সংঘর্ষের মতো অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে।
চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’কে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের দিকে যে পিস্তল দিয়ে গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে, সেটি পরীক্ষার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ধরনের ঘটনায় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সেগুলো কীভাবে থানা থেকে অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছেছে, কতবার হাতবদল হয়েছে এবং কোন কোন অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে—সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় এসেছে।
উদ্ধার না হওয়া গোলাবারুদও উদ্বেগের কারণ:
শুধু আগ্নেয়াস্ত্র নয়, ওই সময় বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদও লুট হয়েছিল। পুলিশ সদরদফতরের তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৫টি উদ্ধার হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি গোলাবারুদ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, অস্ত্র ও গোলাবারুদ যত বেশি সময় অপরাধী চক্রের হাতে থাকবে, সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত এবং উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা তত কঠিন হয়ে পড়বে।
হাতবদলের পর অপরাধী চক্রে পৌঁছাচ্ছে:
তদন্তে এমন ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে থানা থেকে লুটের পর অস্ত্র সরাসরি কোনো অপরাধীর কাছে যায়নি। একাধিক ব্যক্তির হাত ঘুরে পরে তা বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপের কাছে পৌঁছেছে।
চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া একটি বিদেশি পিস্তল পরে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থানা থেকে অস্ত্রটি লুটের পর তা ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জেলের জালে পুলিশের লুট হওয়া শটগান উঠে আসার ঘটনাও তদন্তকারীদের নজরে আসে। পরে পুলিশ সেটি উদ্ধার করে অস্ত্রের রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে।
সম্প্রতি আড়াইহাজার বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের দ্বিতীয় তলার একটি তাক থেকেও একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ২০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, অস্ত্রগুলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হয়েছিল।
এসআরবির নতুন উদ্যোগ:
লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত অভিযান জোরদার করতে এসআরবিকে দায়িত্ব দেওয়ার পর এখন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানিয়েছেন, কোনো ব্যক্তির কাছে লুট হওয়া অস্ত্র থাকলে সেটি নিজে বহন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নিয়ে আসার প্রয়োজন নেই। অস্ত্রটি কোথায় রাখা আছে—এমন তথ্য দিলেই বাহিনী গিয়ে সেটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করবে। তথ্যদাতাকে সরকারি নিয়মে পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি তার পরিচয় গোপন রাখার কথাও জানানো হয়েছে।
এসআরবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির কারণে কেউ হয়তো থানা থেকে অস্ত্র নিয়ে গেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে কীভাবে তা ফেরত দেবেন কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন কি না—এ নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। এমন ব্যক্তিদেরও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
পুরস্কারের ঘোষণা:
লুণ্ঠিত অস্ত্রের সন্ধান দিতে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ভারী অস্ত্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা এবং পিস্তল, রিভলভার ও শটগানের মতো অস্ত্রের তথ্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের কথা জানানো হয়েছে। অন্যান্য লুণ্ঠিত সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের তথ্যের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত হারে পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে।
কেন কঠিন হচ্ছে উদ্ধার:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের মতে, লুট হওয়া অস্ত্রের বড় একটি অংশ দ্রুত হাতবদল হয়ে যাওয়ায় এগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে। কোনো অস্ত্র অপরাধী চক্রের হাতে যাওয়ার পর সেটি অন্য এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হলে আগের অবস্থান ধরে অভিযান চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া অপরাধীরা অনেক সময় নিজেদের পরিচিত অস্ত্রের বদলে নতুন কারও হাতে এসব অস্ত্র তুলে দেয়। ফলে অস্ত্রের মালিকানা ও ব্যবহারকারীর পরিচয় শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের বাড়তি সময় ও তথ্যের প্রয়োজন হচ্ছে।
নির্বাচন ঘিরে নতুন উদ্বেগ:
সামনে স্থানীয় নির্বাচন থাকায় উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের অপব্যবহার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনায় এসব অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পুলিশ সদরদফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, লুণ্ঠিত অস্ত্রের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে। বাকি অস্ত্রগুলো উদ্ধারে অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ বা লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে ৫ আগস্টের লুটের ঘটনায় নিখোঁজ থাকা ১ হাজার ৩০৬টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল গোলাবারুদ উদ্ধার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়—জননিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এসআরবির নতুন সমন্বিত উদ্যোগে নিখোঁজ অস্ত্রগুলোর কতটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


















