অপরাধচিত্র ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অতিথি হিসেবে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ভারত আশা করছে, তারেক রহমান ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের এ আমন্ত্রণে ইতিবাচক সাড়া দেবেন।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন হবে। জোটের ১১টি সদস্য রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের এ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এই সম্মেলনে তারেক রহমানের জন্য ভারত থেকে আমন্ত্রণ আসার কথা স্বীকার করেছেন।
ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্রিকসের সদস্য।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বহুপক্ষীয় জোটের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সুবিধা হলো সেখানে জোটটির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পরিচয় ও বৈঠকের সুযোগ থাকে। এতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জটিলতার অবসান ঘটানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যায়।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট প্রেসিডেন্ট ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির এ প্রসঙ্গে 25 জুলাই শনিবার বলেন, ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের পাশে বৈঠকের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে তা বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের জন্যই ভালো। এর মাধ্যমে জুলাই-আগস্ট (২০২৪) গণঅভ্যুত্থানের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, শীর্ষ নেতাদের সামনাসামনি আলাপের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠার পথ পাওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, দেশগুলোর শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সাক্ষাৎ হলে তা সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে স্থবিরতা দেখা দেয়। তিনি বর্তমানে দিল্লিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। এদিকে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়ে মানবতাবিরোধী মারাত্মক অপরাধে অভিযুক্ত করে তাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ তাকে দেশে ফিরিয়ে সাজা কার্যকর করতে চায়। এমন প্রেক্ষাপটে মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানালেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভারত স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশে নতুন সরকারের সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের স্পিকার ওম বিড়লা এবং তারও আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের যোগদান সেই ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ চায় নিকট প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে। এমন প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সম্মেলনের পাশে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হতে পারে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে বরফ গলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একজন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এর মধ্যে চীনের দালিয়ানে ‘সামার দাভোস’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের পাশাপাশি তিনি একইসঙ্গে দেশটিতে আনুষ্ঠানিক সরকারি সফরও করেছেন। তিনি দালিয়ানে কাজাখস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনিগ্রো ও গিনির প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গেও তারেক রহমানের বৈঠক হয়েছে। জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো গেলে দিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের সময়ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কূটনীতিকরা বলছেন, চলতি বছর ডিসেম্বরে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গাচুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সীমান্তে ভারত পরিচয় নিশ্চিত না করেই অনেক মানুষকে বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দেশটির সীমান্তরক্ষী বিএসএফসহ অন্যদের আক্রমণে সীমান্তবর্তী এলাকায় হত্যাকা- বন্ধ হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে সেপ্টেম্বরে তারেক রহমানের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হলে তা থেকে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
২০১৬ সালে গোয়ায় শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে ব্রিকস-বিমসটেক সংলাপের সূচনা করে ভারত। সেখানে বাংলাদেশের তদানীনন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দিয়েছিলেন। ১০ বছর পর এবার তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ ভারতের সেই উদ্যোগকে পুনরুজ্জীবিত করার অংশ হিসেবে দেখছেন দেশটির পর্যবেক্ষকরা।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি বিমসটেকের মাধ্যমে আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। তারেক রহমানকে পাঠানো আমন্ত্রণটি দিল্লির দ্বিমুখী প্রচেষ্টার অংশ। এর একটি হলো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে বিমসটেকের প্রচার।
দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী শক্তি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাপে- নেউলে সম্পর্কের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট সার্কে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভারত আঞ্চলিক জোট হিসেবে বিমসটেককে এগিয়ে নিতে চায়। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড বিমসটেকের সদস্য। অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমান সরকার চায় সার্ককে সক্রিয় করতে। তারেক রহমানের পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
এমন প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির ওপর তারেক রহমানের ভারতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার কিছুটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে, এমনটি মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ইতিমধ্যে দিল্লি সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এ কে এম শামছুল ইসলাম বিমসটেক নিরাপত্তাপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে চলতি জুলাইয়ে দিল্লি সফর করেছেন।

















