অপরাধচিত্র ডেস্ক: প্রকৃতির রঙিন ক্যানভাসকে জীবন্ত করে তোলার অন্যতম কারিগর প্রজাপতি। প্রকৃতি ঘিরে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো তাদের রঙিন ডানা যেন সৌন্দর্যের বার্তা বহন করে। সবুজ মাঠ, বন কিংবা বাগান ও ঝোপঝাড়ে প্রজাপতির উপস্থিতিই মুহূর্তে বদলে দিতে পারে চারপাশের আবহ, এনে দিতে পারে প্রাণের স্পন্দন।
শুধু প্রকৃতির শোভাই নয়, নকশাখচিত আলপনাময় প্রজাপতির চোখজুড়ানো সৌন্দর্য যুগে যুগে মানুষকেও মুগ্ধ করছে। রঙিন ডানার দোদুল্যমান নৃত্য চিরকালই সববয়সী মানুষকে আকৃষ্ট করছে। কবির কবিতায়, শিল্পীর তুলিতে কিংবা আলোকচিত্রীর ফ্রেমে বারবার ফিরে এসেছে এ কোমল প্রাণী ‘প্রজাপতি’। ডানার রকমারি নকশা, রঙের বৈচিত্র্য আর চঞ্চল উড়ান প্রকৃতিপ্রেমী ও সৌন্দর্যপ্রেমীদের কাছে প্রজাপতিকে এক অনন্য আকর্ষণে পরিণত করেছে।
সৌন্দর্যের পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও প্রজাপতির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফুল থেকে ফুলে উড়ে মধু আহরণের সময় তারা পরাগায়নে সহায়তা করে, যা উদ্ভিদের বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ হিসেবে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতেও প্রজাপতির অবদান উল্লেখযোগ্য।
জানা গেছে, এই রঙিন জগতেরই এক চেনা সদস্য পাতি জহুর বা সূর্যচঞ্চল। এদের বৈজ্ঞানিক নাম পেলোপিডাস ম্যাথিয়াস। এরা হেসপারিডি ( স্কিপার ) পরিবারের ছোট আকৃতির প্রজাপতি। দ্রুতগতির উড়ান এবং ডানার অনন্য নকশার জন্য এরা সহজেই নজর কাড়ে। প্রসারিত অবস্থায় এদের ডানার বিস্তার সাধারণত ৩২ থেকে ৩৮ মিলিমিটার হয়ে থাকে। এদের ডানা জলপাই-বাদামি বা সোনালি-বাদামি আভাযুক্ত, যার ওপর ছড়িয়ে থাকে ছোট ছোট হলদেটে বা সাদা অর্ধস্বচ্ছ ছোপ। নিচের ডানা ধূসর-বাদামি এবং সূক্ষ্ম সাদা দাগে অলংকৃত।
বাংলাদেশসহ ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় এই প্রজাপতির দেখা মেলে। ধানক্ষেত, তৃণভূমি, পতিত জমি, বনাঞ্চল, বাগান, ঝোপঝাড় ও নগর উদ্যান, সব জায়গাতেই এদের অবাধ বিচরণ রয়েছে। মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সকালের প্রথমভাগ ও বিকেলে এরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে।

পাতি জহুর প্রজাতির প্রজাপতি ফুলের মধু পান করলেও ভেজা মাটি, পাথরের স্যাঁতসেঁতে অংশ কিংবা পাখির বিষ্ঠা থেকেও প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ সংগ্রহ করে। মাঝেমধ্যে পাতার ওপর ডানা আংশিক মেলে সূর্যস্নান করতে দেখা যায় এই চঞ্চল প্রজাতিকে।
তবে এদের সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে আরেকটি পরিচয়। পূর্ণাঙ্গ সূর্যচঞ্চল প্রজাপতি গাছের ক্ষতি না করলেও এী শূককীট ধান, আখ, লেবুঘাস, উলুঘাস ও অন্যান্য ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের পাতা খেয়ে ফসলের ক্ষতি করতে পারে। এ কারণে কৃষিবিজ্ঞানে এটি ধানের একটি পরিচিত ক্ষতিকর পোকা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং অনেক সময় রাইস স্কিপার নামেও পরিচিত।
স্ত্রী পাতি জহুর ঘাস বা ধানগাছের পাতায় একটি করে ডিম পাড়ে। তিন থেকে চার দিনের মধ্যে ডিম ফুটে শূককীট বের হয়। পরে পাতাকে ভাঁজ করে নিজের আশ্রয় তৈরি করে এবং কয়েক ধাপে খোলস বদলে পুত্তলিতে পরিণত হয়। প্রায় এক সপ্তাহ পর সেখান থেকে বেরিয়ে আসে নতুন প্রজাপতি।
স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জামাল হোসেন বলেন, প্রজাপতি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়, এটি একটি সুস্থ বাস্তবতন্ত্রের নির্দেশক। কোনো এলাকায় প্রজাপতির বৈচিত্র্য বা উপস্থিতি বেশি থাকলে বোঝা যায় সেখানে জীববৈচিত্র্যের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো রয়েছে। তাই এদের আবাসস্থল সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রকৃতি ও স্রষ্টার সৃষ্টি সম্পর্কে অবগত করতে এ সংক্রান্ত পাঠ পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। এত শিক্ষার্থীরা প্রজাপতির মতো আরও অসংখ্য সৃষ্টি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হবে। মানুষের মধ্যে যতই সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে তাতে আগামী পৃথিবী সমৃদ্ধিশালী হবে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল মতিন বলেন, পাতি জহুর প্রজাপতির পূর্ণাঙ্গ অবস্থা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে এর শূককীট ধানের পাতা খেয়ে ক্ষতি করতে পারে। তাই কৃষকদের নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অপ্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার না করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপকারী ও অপকারী পোকামাকড়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতিকে রঙিন করে তোলা পাতি জহুর তাই একদিকে যেমন সৌন্দর্যের দূত, অন্যদিকে কৃষির বাস্তবতায় পরিচিত এক প্রজাতি। এই দুই পরিচয়ের সমন্বয়ই প্রমাণ করে, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই রয়েছে নিজস্ব গুরুত্ব; আর তাদের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানই পারে পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই কৃষিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে।

















