নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গত নভেম্বরে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দুই শ্যুটারকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। সাড়ে চার মাস পর গ্রেফতার হওয়া এসব ব্যক্তির জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ ও পরিকল্পনার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) দিবাগত রাতে গ্রেফতার করা হয় মো. রাশেদ ওরফে লোপন (৩৫) এবং মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লু (৪০)কে। র্যাবের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি রিভলভার ও তিন রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
তাদের গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা র্যাবকে জানিয়েছে, মূলত সেই এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে এই কিলিং মিশন পরিচালিত হয়। অন্যতম কারণ ছিল ওই এলাকার সন্ত্রাসী মশিউর রহমান মশির ডেভেলপার ব্যবসা, ঝুট ও ফুটপাতের চাঁদাবাজির ব্যবসায় যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া অন্যতম প্রতিপক্ষ ছিলেন। তিনি মশির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। ফলে তাকে হত্যা করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এই হত্যা মিশনে অংশ নেয় ছয় থেকে সাতজন। গ্রেফতারকৃতদের সঙ্গে মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান মশির যোগাযোগ ছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে র্যা ব।
তারা আরও জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড সফল করে তারা দেশ ছাড়তে চেয়েছিল। এজন্য অবৈধভাবে পাসপোর্ট ও কাগজপত্র তৈরির চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে তারা গা ঢাকা দেয়।
শুক্রবার দুপুরে এ উপলক্ষে মিরপুরে র্যাব–৪–এর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে এসব তথ্য জানান কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহাবুদ্দিন কবির।
শাহাবুদ্দিন কবির বলেন, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
যেভাবে হত্যা মিশন সফল করা হয়: যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যায় তিনজন শ্যুটার ছাড়াও তাদের অস্ত্র দেওয়া, গুলির পর সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজেও কিছু লোক ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভাগিনা মাসুম। হত্যা মিশনের অস্ত্র সরবরাহ করেছিল পাতা সোহেল। যুবদল নেতা কিবরিয়াকে নজরদারি করেছিল সুজন। এভাবে ছয় থেকে সাতজনের একটি দল এ মিশনে অংশ নেয়।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় মিরপুর ১২ নম্বরের বি ব্লকে বিক্রমপুর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্যানিটারি নামের একটি দোকানে সন্ত্রাসীরা ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। গুলিতে মারা যান যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া। ওই সময় সন্ত্রাসীদের সবার মুখে মুখোশ ছিল। ফলে তাদের চেনা সহজ ছিল না। পরে তারা একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় উঠে পালিয়ে যায়। তবে সেই অটোরিকশাচালক দ্রুত না চালানোর কারণে তাকে কোমরে গুলি করে আহত করে। ঘটনার পর নিহত কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার দীনা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় তিনি পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে আসামি করেন। বাকিরা ছিল অজ্ঞাত।
বিদেশে পালানোর চেষ্টা দুই শ্যুটারের: অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহাবুদ্দিন কবির দাবি করেন, এ ঘটনার পর থেকে দুই শ্যুটার পলাতক ছিলেন। তারা বিভিন্নভাবে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে চলে যাওয়ারও চেষ্টা করেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরির কাজ শুরু করেছিল তারা। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুরের রূপনগর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাশেদ ওরফে লোপনকে এবং উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লুকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে তাদের দেওয়া তথ্যমতে তার বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি রিভলভার ও তিন রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা র্যাবকে জানিয়েছে, ঘটনার সময় শ্যুটার লোপন তিন রাউন্ড গুলি ব্যবহার করেছিল। দুই রাউন্ড কিবরিয়াকে হত্যায় এবং আরেক রাউন্ড পালিয়ে যাওয়ার সময় ব্যবহার করা হয়। যা জনসাধারণকে রাস্তা থেকে সরিয়ে রাস্তা ফাঁকা করতে ব্যবহার করেছিল লোপন। তারা হত্যার সময় তিনজন ছিল। কিন্তু এ ঘটনার পরপরই জনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বাকি দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলো।
এর আগে আলোচিত এই মামলায় মনির হোসেন ওরফে সোহেল ওরফে পাতা সোহেল এবং মো. সুজন ওরফে বুকপোড়া সুজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।
নেপথ্যে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য: নেপথ্যে কী কারণ থাকতে পারে জানতে চাইলে তিনি জানান, মিরপুরের পল্লবী থানার যুবদলের সদস্যসচিব ছিলেন গোলাম কিবরিয়া। তাঁর বেশ জনপ্রিয়তাও ছিল। বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি সন্ত্রাসী মশি। মশি যে ঝুট ব্যবসা, হাউজিং ব্যবসা, ডেভেলপার ব্যবসা ও ফুটপাথের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেসব বিষয়ে কিবরিয়া জানতেন। এছাড়াও তিনি তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে কিবরিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন মশি। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয় তিন শ্যুটারসহ ছয় থেকে সাতজনকে দিয়ে।

















