নিজস্ব প্রতিবেদক :
বিশ্ব মানবকল্যাণ কামনায় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ গড়ার প্রত্যয়ে শেষ হলো তিন দিনের বাউল উৎসব ও ভক্ত সমাবেশ। কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলাধীন নিশ্চিন্তবাড়িয়া গ্রামের আধ্যাত্মিক সাধক আমদ আলী সাঁইজির আশ্রমে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডক্টর গৌতম কুমার দাশ।
একুশে টেলিভিশনের বিদায়ী প্রধান বার্তা সম্পাদক বিশিষ্ট গবেষক ড. অখিল পোদ্দার ছিলেন মূখ্য আলোচক। শেখ মো. আবু জাফরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত তিনদিনের এ আনুষ্ঠানিকতায় সুফিবাদ ও সাধুদর্শন নিয়ে প্রথম প্রহরে প্রধান অতিথি ছিলেন কুমারখালীর পান্টি কলেজের সহকারি অধ্যাপক এস এম গোলাম আজিজ বাবু। অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে আধ্যাত্মিক সাধক আমদ আলী সাঁইজী সেবা সংঘের কর্মকাণ্ড ও আগামী দিনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন আশ্রমের মহাসচিব মিলন কুমার ঘোষ। সুফিবাদ ও বৈষ্ণব দর্শনের পরম্পরা নিয়ে কথা বলেন বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবক সদ্য সাবেক নির্বাচনের এমপি প্রার্থী তরুণ কুমার ঘোষ, বাউল সাধক আমদ আলী সাঁইজী সেবা সংঘের সভাপতি আব্দুল জলিল, ধামের অন্যতম ভক্ত গণেশ বিশ্বাস, প্রদীপ কুমার শীল, জাহিদ বিশ্বাস, আশুতোষ বিশ্বাস, বিশিষ্ট সাংবাদিক আহমেদ হোসেন বাবু, গোষ্ঠ বিহারীসহ অন্যরা। অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে আধ্যাত্মিক সাধক আমদ আলী সাঁইজী সেবা সংঘের কর্মকাণ্ড ও আগামী দিনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন আশ্রমের সেবায়েত জাহিদ বিশ্বাস।
সভাপতি আব্দুল জলিল বলেন, আমি কে? কোথায় ছিলাম? কেন এলাম এ জগতে? কেমন করে কোথা হতে? Ñ চিরন্তণ এ সত্যকে জানতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবছরের মতো এবারও আধ্যাত্মিক সাধক আমদ আলী সাঁইজী সেবা সংঘ আয়োজন করেছে বিশ্বমানবমুক্তির অন্বেষণ শীর্ষক তাত্ত্বিক আলোচনা ও ভাবসঙ্গীতের। দীর্ঘ আলোচনায় মূখ্য আলোচক ডক্টর অখিল পোদ্দার বলেন, প্রচলিত শাস্ত্রশিক্ষায় সাধনা হয় ঈশ্বরের আর বাউল ফকিরেরা বলেন-দেহ সাধনার কথা। শাস্ত্র বলে, পুঁথি-আচার-জ্ঞান আর বাউলেরা বলেন, মন আর মনের মানুষ। শাস্ত্র বলে জাহির (প্রকাশ) আর বাউলেরা বলেন, বাতুন বা বাতিন (গোপন)। আর ঠিক এভাবেই আমাদের প্রান্ত ঘিরে গড়ে ওঠে এক সমান্তরাল জীবনচর্চা, সমান্তরাল এক জীবনদর্শন। যা আমাদের চেনা-জানার ছককে ভেঙে দেয়। আধ্যাত্মিক সাধক আমদ আলী সাঁইজী সেবা সংঘের কর্মকাণ্ড ও মানবধর্ম চর্চার প্রসারে ধুয়ে মুছে যাবে যত সব কুসংস্কার ও মনের গ্লানি। ড. অখিল পোদ্দারের আশা, মানবমুক্তির এই প্রচার প্রচারণা আর তাবৎ অনুষ্ঠান একদিন সার্বজনীন সংস্কৃতিতে মুখ্য হয়ে উঠবে। কারণ সাম্প্রতিক বাংলাদেশে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উস্কানি ও তথাকথিত মব ভায়োলেন্স সংঘটিত হচ্ছে তা থেকে উতরাতে সাধক আমদ আলী সাঁইজীর পরমত সহিষ্ণুতার দর্শন অনন্য অনবদ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
উল্লেখ্য ড. অখিল পোদ্দার সাধক আমদ আলী সাঁইজী সেবা সংঘের অনুগত সংগঠন স্কুল অফ হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদের পাঠশালা’র সভাপতি। দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় তিনি বলেন, তথাকথিত কুসংস্কারের পাশ কাটিয়ে সত্যিকারের মানবমুক্তির পথ আবিষ্কার করতে দেড়-দুশ’ বছর আগে বাংলার এক প্রান্তে থাকা জমিদার হাছন রাজা সাতপুরুষের হমিদারির মোহ কাটিয়ে প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে সূর বেঁধেছিলেন-আমি হইতে আল্লাহ রসুল আমি হইতে কূল/ পাগল হাছন রাজা বলে তাতে নাই ভুল।’ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর হিবার্ট বিশ্ববিদ্যালয় বক্তব্যে উদ্ধৃত করেছিলেন হাছন রাজার এই পদ। আমাদের আমদ আলী সাঁইজী ঠিক তেমনই সকল কুসংস্কারের উর্ধ্বে উঠে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সম্মিলনে মানবধর্মপ্রচারে ব্রতী হয়েছেন। অখিল পোদ্দার মনে করেন, নির্দিষ্ট ধর্মাধর্ম ভুলে সব মানুষের মেলবন্ধন চারটিখানি ব্যাপার নয়। আমদ আলী সাঁইজী যেটি পেরেছেন তা রীতিমতো সার্বজনীন প্রেমÑভক্তির আধার এবং আধেয়কে এক সুতোয় আবদ্ধ করেছেন। উপস্থিত সাধু সন্তু ও সাধক ভক্তদের উদ্দেশে ড. অখিল পোদ্দার বলেন, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ সার্কুলার জারির পর রবীন্দ্রনাথ একের পর এক স্বদেশি গান রচনা করেছিলেন। তাতে যে বই প্রকাশ করেছিলেন তিনি তার নাম দেশ, স্বদেশ, মুক্তি কিংবা স্বাধীনতা ইত্যাদি কিছুই ছিল না। সে বইয়ের নাম ছিল বাউল। ফাল্গুনী থেকে শুরু করে রক্তকরবী পর্যন্ত প্রায় সব নাটকেই কখনো বাউল, কখনো বৈরাগী, কখনো পাগল, কখনো অন্য কোন নামে প্রান্তিক চরিত্রকে উপস্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যাঁরা আপনমনে গান তো গায়ই উপরন্তু এমন এক সামাজিক অবস্থান তাঁরা নেয় যা আদতে প্রশ্ন করে আমাদের জ্বরাজীর্ণ বন্ধ্যাকে। অতি সাম্প্রতিক যা বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে সেই ময়লা পরিষ্কারের জন্যই সাধুসঙ্গ ও দর্শন আলোচনা অতীব জরুরী।
রবীন্দ্রনাথের বাউলপ্রীতির প্রসঙ্গ টেনে ড. পোদ্দার আরও বলেন, সাধক কবি রবি ঠাকুর বাউল চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। নিজে বাউলের ছবি এঁকেছেন। যাতে আবার নিজেরই স্থিত প্রতিকৃতি। তুলির সে কালির সৌন্দর্যে নিজের প্রবহমানতাই ফুটিয়ে তুলেছিলেন বিশ্বকবি।
রবীন্দ্রনাথ, লালন সাঁইজী, কাজী নজরুল ইসলাম, কাঙাল হরিনাথের নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. অখিল পোদ্দার উল্লেখ করেন-যাঁরা ভাঙতে চায় অচলায়তন বা যক্ষপুরীর গরাদ, যাঁরা কথা বলে শুধু মুক্তির। সুফিবাদ প্রথম থেকেই সেই মানবমুক্তির কথা বলে আসছে। আমরা কায়মনে বিশ্বাস করি-দেহ কিংবা আত্মমুক্তিতেই সীমাবদ্ধ নয় আমাদের সাধনা। সমাজ বা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে মুক্তির অন্বেষণ ছাপিয়ে যাক রাষ্ট্রের সীমানা। সম্প্রীতির এই সুতো ধরেই পৃথিবীটা একদিন মানুষের পৃথিবী হয়ে যাবে। আজকের অস্থির বিশ্বে স্বস্তির বারতা আনতে যা খুব বেশি প্রয়োজন তা হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মানুষকে মানুষের মর্যাদায় মূল্যায়ন ও সাধুতার সঙ্গে সম্মান-ভক্তি জানানো। অমলিন সেই বাসনা থেকেই হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মহামলিনের মহাযজ্ঞে শরিক হতে আমাদের বাৎসরিক এই সাধুসঙ্গের আয়োজন।
সুফিবাদ ও লোকগানের চর্চা অব্যাহত রাখতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মানবতাবাদের পাঠশালার সভাপতি ড. অখিল পোদ্দার। অনুষ্ঠানে প্রফেসর এস এম গোলাম আজিজ বাবু বলেন, চারদিকে যখন সন্ত্রাস জঙ্গীবাদ ও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তখন বিশ্বমানবতাবাদের দর্শনচর্চা বড় বেশি প্রয়োজন। আমদ আলী সাঁইজীর দীক্ষাচর্চা ও সার্বজনীন উন্নয়ন মতবাদ অস্থির পৃথিবী তথা এ দেশের জন্য খুব বেশি প্রয়োজন। সুফিবাদের অতল তলে মানুষের প্রতি মানুষের যে নিবিড় ভালবাসা সেটি আমাকে জীবনের প্রতি বিশ্বস্থ করে তোলে। সুস্থ ও শান্তিময় জীবনসাধনাকে প্রগাঢ় করে তোলে। আমদ আলী সেবা সংঘের কর্মকান্ড শিক্ষিত ও নিষ্কলুষ এক তরুণ শ্রেণী গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সত্যি নান্দনিক সত্যানুসন্ধানের দাবি রাখে।
তিন দিনের এই অনুষ্ঠানে ভাবসঙ্গীত পরিবেশন ও তত্ত্ব আলোচনা করেন রেডিও টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিল্পী বাউল শাহাবুল, পবন সরকার, আব্দুর রহিম, পালাকার আব্দুল কালাম, আব্দুল জলিলসহ অন্যরা। তিন দিনের অনুষ্ঠান শেষে বাল্যসেবার আয়োজন করে সাধক আমদ আলী সেবা সংঘ। এবারের অনুষ্ঠান স্পন্সর করেছে কুমারখালীর ঐতিহ্যবাহী মিলন দধি ভাণ্ডার। অনুষ্ঠান শেষে পুণরায় সভাপতি ও মহাসচিব নির্বাচিত হন আব্দুল জলিল ও মিলন কুমার ঘোষ। সর্বসম্মতিক্রমে স্কুল অফ হিউম্যানিজমের কমিটিতে সভাপতি ড. অখিল পোদ্দারের সাথে নতুন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মো. আবু জাফর। এছাড়া ধামের অন্যতম সেবায়েত জাহিদ বিশ্বাসকে আশ্রম পরিচালনার সুবিধার্থে মূল কমিটির কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত করা হয়। মূল কমিটির গুরুত্বপূর্ণপদে ফিরে আসেন গণেশ বিশ্বাস, রবিউল ইসলাম, আহমেদ হোসেন বাবু, প্রদীপ কুমার শীল, মোজাম্মেল হোসেন, ডালিম বিশ্বাস, ওয়াজেদ আলী, সুমন বিশ্বাস, ইউএস অনন্যা, ঋতি মণ্ডল, তানভীর সুমন, রনি, অগ্নিস্নান পোদ্দার, তন্ময়, ঋতু মণ্ডল, রেজাউল করিম রাজা, সুদেব বিশ্বাসসহ অন্যরা।

















