অপরাধচিত্র প্রতিনিধি (গাজীপুর): গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা সরকারি ইউজার ফি বছরের পর বছর সরকারি কোষাগারে না গিয়ে আটকে ছিল হিসাব শাখায়। ইসিজি পরীক্ষার ১১ লাখ ৪৬ হাজার ১৬০ টাকা, কোভিড-১৯ আরটিপিসিআর পরীক্ষা এবং বহির্বিভাগের সেবার অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি এক তদন্ত প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে।
হাসপাতালের হিসাবরক্ষক সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি একজন নৈশপ্রহরী হিসেবে চাকরি শুরু করেছিলেন। পরে নানা ধাপ পেরিয়ে হাসপাতালের হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব পান। অথচ সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী নৈশপ্রহরী থেকে সরাসরি হিসাবরক্ষক হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে তার দায়িত্বপ্রাপ্তির পুরো প্রক্রিয়াই এখন প্রশ্নের মুখে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তদন্তে মেলে অভিযোগের সত্যতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই পর্যন্ত ইসিজি পরীক্ষার ইউজার ফি হিসেবে আদায় করা ১১ লাখ ৪৬ হাজার ১৬০ টাকা। অথচ এ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। পরে কৈফিয়তের মুখে অভিযোগ স্বীকার করেন সাইফুল ইসলাম। একইসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেন।
তবে তদন্ত কমিটি বলছে, পরে টাকা জমা দিলেই অপরাধের দায় শেষ হয়ে যায় না। সরকারি অর্থ নির্ধারিত সময়ে কোষাগারে জমা না দেওয়া, সরকারি অর্থ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অনুমোদন ছাড়া রাজস্ব আটকে রাখা সরকারি আর্থিক বিধিমালার গুরুতর লঙ্ঘন।
শুধু ইসিজি ফি নয়, তদন্তে আরও উঠে এসেছে কোভিড-১৯ আরটিপিসিআর পরীক্ষার ইউজার ফি বাবদ ৩৪ হাজার এবং বহির্বিভাগের টিকিট ও ল্যাবরেটরি সেবার ছয় হাজার ২৭০ টাকাও দীর্ঘসময় সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, সিসিইউ ও আইসিইউসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রতিদিন শত শত রোগীর ইসিজি পরীক্ষা করা হয়। ওয়ার্ড ইনচার্জরা রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা সরকারি ইউজার ফি হিসাব শাখায় জমা দিলেও সেই অর্থ সরকারি চালানের মাধ্যমে কোষাগারে পাঠানোর পরিবর্তে দীর্ঘদিন জমা দেওয়া হয়নি।
পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন : স্থানীয় সূত্র জানায়, এসএসসি পাস সাইফুল ইসলাম ১৯৯৭ সালে নৈশপ্রহরী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরে অফিস সহকারী কাম টাইপিস্ট এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগ দেওয়ার পর প্রভাব খাটিয়ে হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, নৈশপ্রহরী পদ থেকে সরাসরি হিসাবরক্ষক পদে পদোন্নতির কোনো বিধান নেই। প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ ছাড়া এমন পদে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগও নেই। ফলে কীভাবে তিনি হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দায়িত্বে এলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ইসিজি ও কোভিড পরীক্ষার টাকা তখন জমা দিইনি। তবে তদন্ত কমিটির কাছে দোষ স্বীকার করেছি। পরে সমপরিমাণ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছি।’
তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় তিন বছর ইসিজির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। পরে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা করানো হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পত্র পাঠানো হয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) প্রফেসর জালাল উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অপরাধীদের হাত লম্বা থাকে। তারা টাকার জোরে সব ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।’

















