পটুয়াখালী প্রতিনিধি : মাদক বিরোধী অভিযানে মাদক উদ্ধার না হলেও পুলিশের করা মামলায় মাদক উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে দুই ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে রাঙ্গাবালী থানা-পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন রেজাউল করিম (৪০) নামের এক ব্যক্তি। তিনি রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর ইউনিয়নের কাজিরহাওলা গ্রামের মৃত হাফেজ মৃধার ছেলে। তাঁর ভাই রিয়াজ মৃধা (৩৮) এ মামলার একজন আসামি।
লিখিত অভিযোগে রেজাউল করিম বলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে লোডশেডিং চলাকালে তিনি ও তাঁর ভাই রিয়াজ বসতঘর-সংলগ্ন খোলা জায়গায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাঙ্গাবালী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. আব্বাস তাঁদের শরীর তল্লাশির নামে অশালীন ভাষায় গালাগাল করেন। তাঁরা এর প্রতিবাদ করলে এএসআই আব্বাস তাঁদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই ঘটনার জের ধরে গত ১৬ সেপ্টেম্বর রিয়াজকে তাঁর বসতঘর-সংলগ্ন স্থান থেকে আটক করেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রেজাউল শেখ। একই সময় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে একই এলাকার মেহেদী হাসান (২৩) ও ফিরোজ মীরকেও আটক করে থানায় নেওয়া হয়। পরে টাকা নিয়ে ফিরোজ মীরকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেজাউল করিমের অভিযোগ, ওই দিন শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে পুলিশ আটক ব্যক্তিদের কাছে কোনো মাদক না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে। পরে থানায় নেওয়ার পর তাঁর ভাই রিয়াজকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাঁর ও রিয়াজের স্ত্রী চায়না বেগমের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন এএসআই আব্বাস। তাঁরা ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে রিয়াজকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার কথা বলা হয়। এতে তাঁরা রাজি না হওয়ায় রিয়াজের বিরুদ্ধে মিথ্যা মাদক মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। একই অভিযোগ করেছেন অপর ভুক্তভোগী মেহেদী হাসানের বাবা মোঃ বাচ্ছু প্যাদা। তিনি বলেন,অভিযানের সময় কোন মাদক না পেয়েও পুলিশ মিথ্যা মাদক মামলা দিয়ে তাঁর ছেলেকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।’
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাঙ্গাবালী সদর উপজেলার খালগোড়া বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী ফিরোজ মীর, কাঠ ব্যবসায়ী রিয়াজ মৃধা ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো মেহেদী হাসানকে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে এসআই মো. রেজাউল শেখের নেতৃত্বে একদল পুলিশ আটক করে। পরে রাজনৈতিক তদবিরে ফিরোজ মীরকে ছেড়ে দেওয়া হলেও রিয়াজ ও মেহেদীর বিরুদ্ধে মাদক মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এ মামলার বাদী এসআই রেজাউল শেখ। এজাহার ও জব্দ তালিকায় তাঁদের কাছ থেকে ৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ওই অভিযানের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মামলায় রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন দক্ষিণ যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান গাজী ও একই ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক মো. ইসমাইল মাঝিকে সাক্ষী করা হয়েছে।
সাইদুর রহমান গাজী ও ইসমাইল মাঝি মুঠোফোনে বলেন,‘এসআই রেজাউল শেখ মাদকবিরোধী অভিযানের নামে রিয়াজ মৃধা, মেহেদী হাসান ও ফিরোজ মীরকে খালগোড়া বাজার থেকে আটক করেন। লোকজনের উপস্থিতি দেখে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। তখন পুলিশ তাঁদের জানায়, আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কিছু পাওয়া যায়নি, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে অন্য অভিযোগ রয়েছে। এরপর তিনজনকে থানায় নেওয়া হয়।’
তাঁরা বলেন,‘আটক ব্যক্তিদের স্বজনদের অনুরোধে তাঁরা থানায় গিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন তাঁদের এসআই রেজাউল শেখের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে ফিরোজ মীরকে ছেড়ে দেওয়া হলেও রিয়াজ ও মেহেদীকে ছাড়তে পুলিশ টালবাহানা করে।
সাইদুর রহমান ও ইসমাইল মাঝির দাবি, ফিরোজ মীরকে ছাড়ানোর জন্য জিম্মাদার হিসেবে এসআই রেজাউল তাঁদের কাছ থেকে পাঁচটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেন। পরে ওই স্বাক্ষর করা কাগজ জব্দ তালিকায় পরিণত করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো মাদক উদ্ধার না হলে জব্দ তালিকায় সাক্ষী হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’
ওই দিন আটক হওয়ার পর থানা থেকে ছাড়া পাওয়া ফিরোজ মীর বলেন,‘ঘটনার সময় রিয়াজ তাঁর শিশুসন্তানসহ কয়েকজন স্কুলপড়ুয়া শিশুকে নিয়ে তাঁর বাসায় অবস্থান করছিলেন। শিশুদের সঙ্গে তিনিও সেখানে যান। পরে এসআই রেজাউল শেখসহ কয়েকজন পুলিশ রিয়াজের ঘরে প্রবেশ করে শিশুদের বের করে দেন। এরপর ঘর ও তাঁদের শরীর তল্লাশি করা হয়। তাঁর দাবি, তল্লাশি করে কোনো মাদক না পেলেও তাঁদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।’
মামলার এজাহারে ঘটনাস্থল হিসেবে খালগোড়া বাজার-সংলগ্ন শহিদ প্যাদার দোকানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শহিদ প্যাদা (৬০) বলেন,‘ঘটনার দিন রিয়াজ তাঁর শিশুসন্তানসহ আরও কয়েকজন শিশুকে নিয়ে আমার ঘরে ছিলেন। এ সময় পুলিশ এসে রিয়াজসহ আরও দুজনকে থানায় নিয়ে যায়। তবে তাঁদের কাছ থেকে কোনো মাদক পায়নি পুলিশ।’
রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. বশির তালুকদার বলেন, রিয়াজের মা ও স্ত্রীর অনুরোধে তিনি ওই দিন থানায় গিয়ে ওসি ও এসআই রেজাউল শেখের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, পুলিশের পক্ষ থেকে রিয়াজের কাছে কোনো মাদক না পাওয়ার কথা জানানো হলেও তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।’
অভিযোগের বিষয়ে এসআই মো. রেজাউল শেখ বলেন, ‘এ বিষয়ে ওসি স্যার কথা বলবেন। আমাকে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই আমি বক্তব্য দেব না।’
রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এখানে বিশেষ অভিযান ছিল। যাঁরা মাদক সেবন করেন বা মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা আছে। তবে এ ক্ষেত্রে টুকিটাকি ভুলত্রুটি হতে পারে। কিন্তু এত দিন পরে যদি এসব কথা বলেন, তাহলে আমাদের জন্য সমস্যা। আমরা সবাই মাদকের বিরুদ্ধে।’
অভিযোগের বিষয়ে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল বলেন,এ ঘটনায় এক ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের বিষয়টি তদন্তে প্রমানিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’


















