বরগুনা প্রতিনিধি :
বরগুনায় প্রায় ৩৬ কোটি টাকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগের মধ্যেই অধিকাংশ বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মাঠপর্যায়ে কাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও কাগজে-কলমে সম্পন্ন দেখিয়ে একটি প্যাকেজের শতভাগ এবং আরও দুটি প্যাকেজের ৭৮ থেকে ৯৬ শতাংশ বিল পরিশোধ করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সরকার দেশের ১০টি জেলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে বরগুনার তিনটি প্যাকেজে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ২৫ অক্টোবর এ বিষয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কিছু তৎপরতা দেখালেও কাজের মান যাচাই বা অভিযোগ তদন্ত না করেই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গোপনে অধিকাংশ বিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিধি অনুযায়ী চূড়ান্ত বিল ছাড়ের আগে উপকারভোগীর প্রত্যয়নপত্র, সহায়ক চাঁদা জমার রশিদ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক হলেও এসব শর্ত পূরণ না করেই বিল ছাড় করা হয়েছে।
নথিতে দেখা যায়, ৩৯ নম্বর প্যাকেজের চূড়ান্ত বিল হিসেবে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৫২০ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ৩৮ নম্বর প্যাকেজের কাজ চলমান থাকলেও ১২ কোটি ৭২ লাখ ৮২ হাজার ২৫২ টাকার বিপরীতে প্রায় ৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, অর্থাৎ ৭৮ শতাংশ বিল ছাড় করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৪০ নম্বর প্যাকেজের ১১ কোটি ৫৮ লাখ ৬৮ হাজার ২৮৪ টাকার চুক্তিমূল্যের বিপরীতে ১১ কোটি ২১ লাখ ৬১ হাজার ৭৫৪ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ৩৮ ও ৪০ নম্বর প্যাকেজের কাজ এখনো চলমান রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বরগুনার তিনটি উপকূলীয় উপজেলায় ৫ হাজার ৫৪২টি পরিবারের জন্য তিন হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের জন্য ৪৫ হাজার টাকা এবং প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ৬ হাজার ৯৮০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তিনটি প্যাকেজের কাজ পায় বরগুনার মেসার্স কামাল এন্টারপ্রাইজ।
২০২২ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের মে মাসে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, যেসব কাজ অসম্পূর্ণ ছিল, তার অধিকাংশই এখনো একই অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
প্রকল্প নকশা অনুযায়ী, গর্ত করে বালু দিয়ে ভিত্তি মজবুত করার পর ১০ ইঞ্চি সিসি ঢালাই ও ৫ ইঞ্চি ইটের গাঁথুনি দিয়ে প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের কথা। এরপর সেখানে তিন হাজার লিটারের ট্যাংক বসিয়ে টিনের চালের সঙ্গে পাইপলাইন সংযোগের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্থানে শুধু প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করে কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও ট্যাংক নেই, কোথাও পাইপলাইন বসানো হয়নি। ফলে অধিকাংশ স্থাপনা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে।
উপকারভোগীরা অভিযোগ করেন, প্রথম শ্রেণির ইটের পরিবর্তে দ্বিতীয় শ্রেণির ইট, নিম্নমানের বালু এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম সিমেন্ট ব্যবহার করায় অনেক প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে ফেটে গেছে কিংবা ভেঙে পড়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলার চালিতাতলী, ফালিশাতলী, নলটোনা ইউনিয়ন এবং পাথরঘাটা উপজেলার বড় টেংরা, ছোট টেংরা ও কোড়ালিয়া গ্রামের একাধিক উপকারভোগী জানান, তাঁদের বাড়িতে শুধু প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করা হয়েছে। ট্যাংক, পাইপলাইন, ফিল্টারসহ প্রয়োজনীয় কোনো সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি।
৩৯ নম্বর প্যাকেজের আওতাধীন সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের ফালিশাতলী গ্রামের মো. ইব্রাহীম হাওলাদারের বাড়িতে কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে প্রায় দেড় বছর আগে নির্মিত একটি প্ল্যাটফর্ম ছাড়া আর কিছুই নেই।
ইব্রাহীম হাওলাদার বলেন, “দেড় বছর আগে প্ল্যাটফর্ম করে রেখে গেছে। এরপর আর কেউ আসেনি। কোনো মালামালও দেয়নি। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাইনি।”
একই চিত্র দেখা গেছে নলটোনা ইউনিয়নের গাজী মাহামুদ গ্রামে। সেখানে রুহুল আমিন, খোকন পেয়াদা ও মোসা. কারিমা বেগমের বাড়িতেও শুধু প্ল্যাটফর্ম রয়েছে।
কারিমা বেগমের শাশুড়ি হাসিনা বেগম বলেন, “দেড় বছর আগে প্ল্যাটফর্ম করে রেখে গেছে। এরপর ঠিকাদারের লোকজন আর আসেনি। কোনো ট্যাংক, পাইপ বা অন্য মালামালও দেয়নি।”
নলটোনা ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে দুলাল, মো. সবুজ, রাসেল কাজী, জামাল খানসহ অনেক উপকারভোগীর বাড়িতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলার উপকারভোগীরাও জানান, কাজ সম্পন্ন হয়েছে—এমন কোনো প্রত্যয়নপত্র তাঁরা ঠিকাদারকে দেননি। কারণ, কাজই শেষ হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মেসার্স কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কামাল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে মুঠোফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, বিল পরিশোধের সময় বরগুনায় নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন রাইসুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি টাঙ্গাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত।
চূড়ান্ত বিল পরিশোধের বিষয়ে জানতে চাইলে রাইসুল ইসলাম বলেন, “৩৯ নম্বর প্যাকেজের চূড়ান্ত বিল দিয়েছি কি না, তা এই মুহূর্তে মনে নেই। সব প্যাকেজের সাইট এত ছড়িয়ে রয়েছে যে নির্দিষ্ট করে কোনটি সম্পন্ন আর কোনটি অসম্পূর্ণ, তা বলা কঠিন। সাইট লিস্ট পাঠান, দেখে বলতে পারব।”
প্রকল্প পরিচালক বাদশাহ মিয়া বলেন, “তালিকাভুক্ত উপকারভোগীদের কারও ক্ষেত্রে আংশিক কাজ হয়েছে, আবার কারও ক্ষেত্রে কিছুই হয়নি—এমন হওয়ার কথা নয়। নির্দিষ্ট তথ্য পেলে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আগেও অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। শুধু বরগুনা নয়, অন্য জেলাগুলো থেকেও অভিযোগ এসেছে। সরেজমিনে গিয়ে ত্রুটিমুক্তভাবে কাজ সম্পন্ন নিশ্চিত করা হবে।”
বরগুনার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী শিশির কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। তাই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। তবে চূড়ান্ত বিলের আগে উপকারভোগীর প্রত্যয়নপত্র, সহায়ক চাঁদার ব্যাংক রশিদ ও মাঠপর্যায়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক। কাগজপত্র যাচাই ছাড়া মন্তব্য করা সম্ভব নয়। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পানি অধিকার ফোরামের বরিশাল বিভাগীয় সদস্য এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিচ টু আনরিচ’-এর পরিচালক রফিকুল আলম বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দিন দিন বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও অর্থ লোপাটের কারণে প্রকৃত উপকারভোগীরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি অর্থের অপচয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।”

















