নেত্রকোণার প্রতিনিধি :
নেত্রকোণার বারহাট্টায় হামলায় রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর থানায় অভিযোগ দিতে গিয়ে উল্টো সালিশের পরামর্শ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন এক নারী।
ভুক্তভোগীর দাবি, বারহাট্টা থানার ওসি চম্পক দাম প্রথমে লিখিত অভিযোগ নিতে চাননি। পরে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার কথা বলা হয়।
ভুক্তভোগী মুক্তা বেগম (৪৫) ও তাঁর মেয়ে আঁখি আক্তারের অভিযোগ, শনিবার রাতে বারহাট্টা থানায় অভিযোগ দিতে গেলে অভিযুক্তকে আগে থেকেই থানায় বসে থাকতে দেখেন। এরপর অভিযোগ গ্রহণের পরিবর্তে ওসি দুই পক্ষকে ডেকে সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পরামর্শ দেন।
শনিবার দিবাগত রাতে বারহাট্টা থানায় এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগীরা হলেন, উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের আলোকদিয়া গ্রামের আব্দুল্লাহর স্ত্রী মুক্তা বেগম (৪৫) এবং তাঁর মেয়ে আঁখি আক্তার (২৮)। অভিযুক্ত বাদশা মিয়া (৩৬) পাশের ধনপুর গ্রামের মৃত নুর হাকিমের ছেলে। তিনি পেশায় মৎস্য ব্যবসায়ী।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার দুপুরে বাদশা মিয়া তাঁর স্ত্রী আঁখি আক্তারকে মারধর করতে শ্বশুরবাড়িতে যান। মেয়েকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে শাশুড়ি মুক্তা বেগমকে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তাঁর পিঠ ফেটে রক্তপাত হয়। এ ছাড়া মা-মেয়েকে কিল-ঘুষি মেরে ও টেনেহিঁচড়ে আহত করা হয়। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
পরে রাত প্রায় ১০টার দিকে তাঁরা বারহাট্টা থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে সেখানে আগে থেকেই অভিযুক্ত বাদশা মিয়াকে দেখতে পান বলে দাবি করেন।
মুক্তা বেগম বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে ওসি প্রথমে তা নিতে চাননি। বুধবার দুই পক্ষকে থানায় ডেকে সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার কথা বলে আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। পরে আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে আবার থানায় ফিরে অভিযোগ জমা দিই।
আমাদের পরিচিত এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হলে এরপর অভিযোগ নেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ নেওয়ার পরও ওসি বলেন, আগে আলোচনা হবে, এরপর প্রয়োজন হলে মামলা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “থানায় গিয়ে দেখি অভিযুক্ত আগে থেকেই সেখানে বসে আছে। পুলিশের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলেই হয়তো অভিযোগ নিতে অনীহা ছিল। আমরা সালিশ চাই না। থানা তো সালিশের জায়গা নয়।”
একই অভিযোগ করেন আঁখি আক্তার। তিনি বলেন, “অভিযোগ জমা দিলেও ন্যায়বিচার পাব কি না, তা নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি। আমাদের মারধর করে অভিযুক্ত থানায় গিয়ে পুলিশের সঙ্গে বসে ছিল। ওসি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আলোচনার কথাই বলছিলেন।”
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ২০২৩ সালে আঁখি আক্তারের সঙ্গে বাদশা মিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে তাঁর ওপর নির্যাতন চলছিল। কয়েক লাখ টাকা দেওয়ার পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। এ ঘটনায় গত বছরের নভেম্বরে আঁখি আদালতে একটি মামলা করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন। তাঁদের এক বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। সম্প্রতি বাদশা মিয়া গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর থেকেই দাম্পত্য বিরোধ আরও তীব্র হয় এবং আঁখি বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এরই জেরে শনিবারের হামলার ঘটনা ঘটে বলে পরিবারের দাবি।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত বাদশা মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বারহাট্টা থানার ওসি চম্পক দাম বলেন, “অভিযোগ নেওয়া হয়েছে। যেহেতু এটি পারিবারিক বিষয়, তাই আলোচনা করে শেষ করার কথা বলা হয়েছে।” তবে জখম হওয়া নারীর অভিযোগ প্রথমে গ্রহণ না করার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, “হামলায় কেউ আহত হলে তার অভিযোগ গ্রহণ করা পুলিশের দায়িত্ব। এমন ঘটনায় থানায় সালিশের কোনো বিধান নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”


















