মুরগির ঘর ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ অস্বীকার কয়েকজন কথিত সাক্ষীরা, জমি নিয়ে বিরোধ থেকে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়ার দাবি অভিযুক্তদের
অপরাধচিত্র প্রতিনিধি মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে মারধর, মুরগির ঘর ভাঙচুর, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মামলার বাদী শাহিদা বেগমের অভিযোগ, প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে আহত করেছেন এবং তাঁর স্বামী মাহবুব খানের কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে গেছেন। তবে মামলায় সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা কয়েকজন ব্যক্তি ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ মারামারি ও ঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনী বলে দাবি করেছেন। আবার একজন প্রতিবেশীর বক্তব্যে অভিযোগপত্রের বিবরণের সঙ্গে পার্থক্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঘটনাটিকে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হয়রানিমূলক মামলা হিসেবে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে, মির্জাগঞ্জে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলা গ্রহণ ও তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি, চিকিৎসার কাগজপত্র, ভিডিও বক্তব্য নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
অভিযোগপত্রে মারধর ও ঘর ভাঙচুরের বর্ণনা:
মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মির্জাগঞ্জ উপজেলার দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নের পশ্চিম সুবিদখালী গ্রামের বাসিন্দা শাহিদা বেগমের পরিবারের সঙ্গে একই বাড়ির কয়েকজন ব্যক্তির জমিজমা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তাঁর স্বামী মাহবুব খান সংশ্লিষ্ট জমির একটি অংশ দলিলমূলে ক্রয় করেছেন। এ জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে দুই পক্ষের মধ্যে পূর্ব থেকেই বিরোধ চলে আসছিল।
অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর ২০২৬ বিকেল ৩টার দিকে চারজন ব্যক্তি দা, গাবের লাঠি, শাবল ও লোহার পাইপ নিয়ে বাদীপক্ষের বসতঘরের উত্তর পাশে নির্মিত একটি মুরগির ঘর ভাঙচুর করেন। এতে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাহিদা বেগমের অভিযোগ, ঘর ভাঙচুরে বাধা দিতে গেলে তাঁকে লোহার পাইপ ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। এতে তাঁর পিঠ, ঘাড়, রানসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে।
অভিযোগপত্রে তাঁর বুকে লাথি মারার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর গলায় থাকা আট আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন, যার মূল্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আসামিরা ছিনিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই ঘটনায় তাঁর স্বামী মাহবুব খানের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ও ১৭ হাজার টাকা মূল্যের একটি ভিভো মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। সব মিলিয়ে ঘর ভাঙচুর ও মালামালের ক্ষতির পরিমাণ দুই লাখ ৪২ হাজার টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর শাহিদা বেগমকে মির্জাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় এবং তাঁর স্বামীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসার কাগজপত্র ও ভাঙচুরের ছবি আদালতে দাখিল করা হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব নথি ও আলামতের সত্যতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যে ভিন্নতা:
মামলার অভিযোগের সঙ্গে কয়েকজন কথিত সাক্ষীর বক্তব্যে পার্থক্য দেখা গেছে। ভিডিও সাক্ষাৎকারে একজন ব্যক্তিকে ঘটনার দিন মারধর হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মারামারির মতো কোনো ঘটনা ঐ দিন ঘটেনায় ।”
ঘটনার সূত্রপাত কী নিয়ে—এমন প্রশ্নের জবাবে জমিজমা নিয়ে বিরোধের কথা বলেন তিনি। ভিডিওতে উপস্থিত অন্য একজন স্বাক্ষি মজিজমার বিরোধের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।
মামলার দুই নম্বর ও চার নম্বর সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা মো. হারুন খান ও তাঁর স্ত্রী দাবি করেছেন, তাঁরা কোনো মারামারি দেখেননি এবং এ বিষয়ে কিছু জানেন না। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলায় তাঁদের সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টি তাঁদের জানা ছিল না।
পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা মো. আউব খানও এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
এ ছাড়া মামলার সাক্ষী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মহাসিন খান ভিডিও বক্তব্যে মারামারির ঘটনা অস্বীকার করেছেন বলেন ঐ দিন মারামারির ঘটনা ঘটেনী। শাহিদা বেগমের স্বামী মাহবুব খানের বড় ভাই এবং মামলার আরেক সাক্ষী মাসুদ খানও ঘটনাটিকে মিথ্যা দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মারামারি বা হানাহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাঁকে সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও তিনি আগে অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেন।
তবে এসব স্বাক্ষিদের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং আদালতে তাঁদের সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির প্রকৃত অবস্থা আদালতের যানা প্রয়োজন।
প্রতিবেশীর বক্তব্যে উঠে এসেছে বাঁশ ও জমি নিয়ে বিরোধের প্রসঙ্গ:
ঘটনার দিন কী হয়েছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে এক প্রতিবেশী জানান, তিনি লতিফ খানের সঙ্গে বাঁশ কাটছিলেন। পরে একটি বাঁশ শাহিদারর কাছে দেওয়া হয় এবং সেটি সাহিদা বাড়ি নিয়ে যায়, এরপর বাঁশ ও জমি-সংক্রান্ত কথাবার্তা থেকে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
ওই প্রতিবেশীর দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হলেও কোনো মারামারি হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মুরগির ঘরও ভাঙা হয়নি।
প্রতিবেশীর এই বক্তব্যের সঙ্গে অভিযোগপত্রে বর্ণিত মারধর ও ঘর ভাঙচুরের অভিযোগের পার্থক্য রয়েছে। ফলে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট অন্য প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসার নথি, ঘটনাস্থলের আলামত এবং ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ করা প্রয়োজন।
বাদী ও তাঁর স্বামীর বক্তব্য:
মামলার বাদী শাহিদা বেগমের দাবি, তাঁর মুরগির ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে এবং গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার বিষয়ে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসা করলে বিস্তারিত জানা যাবে।
অন্যদিকে, তাঁর স্বামী ও মামলার এক নম্বর সাক্ষী মাহবুব খান বলেছেন, তিনি মামলা করেছেন এবং এ বিষয়ে যা বলার আদালতেই বলবেন।
বাদীপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের ওপর হামলা ও মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে মামলার কয়েকজন কথিত সাক্ষী ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
অভিযুক্তদের দাবি, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হয়রানি:
মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, ঘটনার দিন তাঁরা পরিবারের একজনের মৃত্যুর ঘটনায় জানাজা ও দাফনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলা করা হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কয়েকজন বাসিন্দা বলেন জমি-সংক্রান্ত বিরোধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযুক্তদের দাবি, তাঁরা ঘটনার বিষয়ে অবগত ছিলেন না এবং এ ধরনের মামলা থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা চান। তাঁদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে ঘটনার সময় তাঁদের অবস্থান, জানাজা ও দাফনের কাজে উপস্থিত ছিলেন তাদেরকে জিঞাষ করা হোক।
আগের মামলার বিষয়টিও সামনে এনেছেন অভিযুক্তরা:
অভিযুক্তদের ভাষ্য অনুযায়ী, একই বিরোধের জেরে গত ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মির্জাগঞ্জের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঁচজনকে আসামি করে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় দুজনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
মামলা গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন:
মির্জাগঞ্জ বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা গ্রহণ ও তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দার মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের অভিযোগ, কোনো কোনো ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ছাড়াই মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন ঘটনায় সাধারণ মানুষকে আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজনের দাবি, কিছু ব্যক্তি ও আইনজীবী মামলা পরিচালনার প্রক্রিয়াকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের কাজে ব্যবহার করেন।
অভিযোগপত্রের তারিখ নিয়েও প্রশ্ন:
প্রাপ্ত অভিযোগপত্রের অনুলিপিতে ঘটনার তারিখ ২২ অক্টোবর ২০২৬ উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, নথির ওপর দৃশ্যমান একটি সিল বা তারিখে ৫ অক্টোবর ২০২৬ লেখা দেখা যায়। ঘটনার তারিখের আগে এমন তারিখ থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এটি মূল নথি দাখিলের তারিখ, পূর্ববর্তী কোনো সিল, অনুলিপি প্রস্তুতের তারিখ নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা আদালতের মূল নথি ও গ্রহণসংক্রান্ত রেকর্ড পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি:
সামগ্রিকভাবে, মামলার অভিযোগপত্র, বাদীপক্ষের বক্তব্য, অভিযুক্তদের দাবি এবং ভিডিওতে দেওয়া কথিত সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে একাধিক পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে মারধর, মুরগির ঘর ভাঙচুর, স্বর্ণের চেইন ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ঘটনার সত্যতা নির্ধারণে চিকিৎসার নথি, হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টার, ঘটনাস্থলের ছবি, ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ, সাক্ষীদের পরিচয় এবং আদালতে দাখিল করা মূল নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।


















