কক্সবাজার ব্যুরো:কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ২৪ ঘণ্টা পেরিয়েও নেভানো যায়নি। আগুনের শিখা বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে কাজ শুরুর কথা রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দলের। এর আগে মঙ্গলবার রাতে দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে যান বাপেক্সের বিশেষজ্ঞরা। এদিকে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও ভূগর্ভ থেকে অবিরাম গ্যাস বের হতে থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলপ্রধান এসএম নাফিফুন আরহাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করেন, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। সেখান থেকে ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।তিনি জানান, গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন লাগতে পারে।আগুনের রং ও ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা।
তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। একই কারণে গ্যাসের মজুত সম্পর্কেও এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।তিনি আরও বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখাই প্রধান অগ্রাধিকার। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি জানতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোট খাল সেতুর কাছে মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য মাটি খোঁড়ার সময় গ্যাস বের হতে শুরু করে। গর্ত থেকে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বের হওয়ার পরপরই সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে।উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে বাপেক্স, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অবহিত করা হয়।
এদিকে আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের হোটেলকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।উখিয়া উপজেলার ইউএনও পান্না আক্তার বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আগুনের শিখা বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই আগুনের প্রকৃত ঝুঁকি নিরূপণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এ কারণে এলাকাটি নিরাপত্তাবলয়ের আওতায় এনে বাপেক্সকে খবর দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে।

















