Monday , 2 November 2026 |
  1. অনিয়ন ও দুর্নীতি
  2. অপরাধ
  3. অপরাধচিত্র বিশেষ
  4. অর্থনীতি
  5. আইন-আদালত
  6. আন্তর্জাতিক
  7. কক্সবাজার
  8. কিশোরগঞ্জ
  9. কুড়িগ্রাম
  10. কুমিল্লা
  11. কুষ্টিয়া
  12. কৃষি ও প্রকৃতি
  13. ক্রীড়াঙ্গন
  14. খুলনা
  15. খেলাধুলা

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে উত্তাল পোশাকশিল্প

প্রতিবেদক
Newsdesk
November 2, 2026 1:47 pm

গাজীপুর-সাভারে সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও কারখানায় ছুটি; উৎপাদন ব্যাহত দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানে

নিজস্ব প্রতিবেদক :

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলজুড়ে অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে একের পর এক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করছেন কর্তৃপক্ষ। দুপুর পর্যন্ত গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ায় প্রায় ২১০টি পোশাক কারখানা বন্ধের খবর পাওয়া গেছে।

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন ঘিরে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন, কোথাও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে যান চলাচল বন্ধ থাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ, ১৫০ কারখানায় ছুটি

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় সকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। কোনাবাড়ী, সফিপুর ও মৌচাক এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরাও সড়কের একাধিক স্থানে জড়ো হয়ে আন্দোলনে অংশ নেন।

শ্রমিকদের অবরোধে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সড়কের উভয় পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট ছড়িয়ে পড়ে। ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গাজীপুর শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলমান পরিস্থিতিতে সোমবার দুপুর পর্যন্ত প্রায় ১৫০টি পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিজিবির ১০ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

সাভার-আশুলিয়ায় সংঘর্ষ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ

ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও সকাল থেকে শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষ ও উত্তেজনার মধ্যে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর শিল্পাঞ্চলের অর্ধশতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে রাস্তায় বিক্ষোভ করছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মিরপুরে শ্রমিকদের অবস্থান, আটক একাধিক ব্যক্তি

রাজধানীর মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১২ নম্বর পর্যন্ত প্রধান সড়কের বিভিন্ন স্থানে পোশাকশ্রমিকদের উপস্থিতি দেখা গেছে। গত দিনের সংঘর্ষের পর সোমবার সড়ক অবরোধ না করায় ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তবে মিরপুর-১১ নম্বরে কয়েক দফায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে একজনকে আটক করার পাশাপাশি কাফরুল থানা পুলিশ আরও পাঁচজনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।

এদিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কেও কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা একই দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। ফলে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে।

এক দিনে ৫২৯ কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব শুধু সোমবারের কারখানা বন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত রোববার (১ নভেম্বর) গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় তিন শতাধিক কারখানা বন্ধ ছিল। একই দিনে শ্রমিকদের কাজে অনুপস্থিতি ও উৎপাদন পরিস্থিতির কারণে ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু।

শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কারখানা পরিচালনা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন মালিকপক্ষ। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

মজুরি বোর্ডের দ্রুত সিদ্ধান্ত চান শ্রমিক নেতারা

এদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে বিলম্ব না করে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্তের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক প্রতিনিধিরা। সোমবার শ্রম ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার বলেন, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল। সে হিসাবে আগামী ডিসেম্বরে তিন বছর পূর্ণ হবে। শ্রমিকেরা চান, নতুন মজুরি ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে কার্যকর হোক।

তিনি আরও বলেন, মজুরি নির্ধারণের আলোচনা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। বৈঠকের মধ্যে দীর্ঘ বিরতি না দিয়ে প্রয়োজনে রাতভর আলোচনা করেও দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আহ্বান জানান তিনি।

শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, আন্দোলন দমাতে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ও সাধারণ শ্রমিকদের গ্রেপ্তার এবং হয়রানিমূলক মামলার ঘটনা ঘটছে। আটক শ্রমিকদের মুক্তি ও দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে সরকারের বক্তব্য

সোমবার সকালে সচিবালয়ে পোশাকশিল্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চলমান শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি দাবি করেন, শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সীমান্তের ওপারের ইশারায় দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণে সরকার আন্তরিক। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি বাস্তবতার আলোকে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে। আন্দোলনের নামে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

আজ বিকেলে শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে চলমান আন্দোলন, শ্রমিকদের দাবি এবং ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সামনে কী হবে, অনিশ্চয়তা শিল্পাঞ্চলে

পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত। এই খাতে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, রপ্তানি কার্যক্রম ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় মজুরি বৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও কারখানা পরিচালনার বাস্তবতা—দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে শ্রমিকদের দাবি ও মালিকপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে কার্যকর সমঝোতা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত না এলে শ্রমিক অসন্তোষ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সর্বশেষ - অপরাধচিত্র বিশেষ