Tuesday , 3 November 2026 |
  1. অনিয়ন ও দুর্নীতি
  2. অপরাধ
  3. অপরাধচিত্র বিশেষ
  4. অর্থনীতি
  5. আইন-আদালত
  6. আন্তর্জাতিক
  7. কক্সবাজার
  8. কিশোরগঞ্জ
  9. কুড়িগ্রাম
  10. কুমিল্লা
  11. কুষ্টিয়া
  12. কৃষি ও প্রকৃতি
  13. ক্রীড়াঙ্গন
  14. খুলনা
  15. খেলাধুলা

চট্টগ্রাম কাস্টমসে সিঅ্যান্ডএফ সিন্ডিকেটের প্রভাব!

প্রতিবেদক
Newsdesk
November 3, 2026 10:47 am

মিথ্যা ঘোষণা, নিষিদ্ধ পণ্য খালাসে এস এম সাইফুলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

এ কে এম বেলাল উদ্দিন: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারিত আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশ এবং শুল্ক ফাঁকির মাধ্যমে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আনার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলমের বিরুদ্বে তাঁর মালিকানাধীন এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে একাধিক সন্দেহজনক চালান খালাসের চেষ্টা ঘিরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এনবিআর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল সিইসি তদন্তে নানা অসঙ্গতি ও অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি

অভিযোগ রয়েছে, কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানি, নিষিদ্ধ প্রসাধনী খালাসের চেষ্টা এবং কনটেইনারের নিরাপত্তা সিল পরিবর্তনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব চালানের একটির কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সিআইসিকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ নিয়ে কাস্টমসের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে এস এম সাইফুল আলমের প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত চালান পরীক্ষা ও আটকের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এমনকি কাস্টমস কমিশনারের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ও প্রকাশ্য প্রটোকল নিয়েও দপ্তরের ভেতরে নানা আলোচনা রয়েছে।

মিথ্যা ঘোষণায় চালান, গোয়েন্দা নজরদারিতে অনিয়ম

সূত্র জানায়, পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারভিত্তিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কাফ করপোরেশনের একটি চালান খালাসের দায়িত্ব নেয় এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল। ওই চালানের বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-১০৯৮৭৬৬। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘোষণায় উল্লেখ করা পণ্যের সঙ্গে প্রকৃত আমদানিকৃত পণ্যের ব্যাপক অসংগতি ছিল। চালানটিতে আমদানি নিষিদ্ধ পাকিস্তানি ‘গৌরী’ বিউটি ক্রিম থাকার তথ্য পায় সিআইসি।

গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে চালানটি লক করার পর কায়িক পরীক্ষার কার্যক্রম নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় পর চালানটি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়। এ সময় চালানটির পরীক্ষা বিলম্বিত করা এবং তদন্তে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে।

চালানটি আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিআইসির তৎকালীন মহাপরিচালক আবদুর রকিবকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এনবিআরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করা হয়নি।

টুথপিকের আড়ালে প্রসাধনী ও নিষিদ্ধ ক্রিম

কাস্টমস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কাফ করপোরেশনের চালানে চীন থেকে প্রায় সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দেওয়া হলেও পরীক্ষায় পাওয়া যায় মাত্র দেড় টন। বাকি অংশের পরিবর্তে বিপুল পরিমাণ পাকিস্তানি গৌরী বিউটি ক্রিম থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

এ ছাড়া চালানটিতে ঘোষণাবহির্ভূত বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, প্রিমিয়াম সানগ্লাস ও অন্যান্য পণ্য পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব পণ্যের মধ্যে বিএসটিআইয়ের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ক্রিমও রয়েছে বলে জানা গেছে।

একই চালানে যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রে পাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। এসব পণ্যের আমদানি অনুমোদন, শুল্ক নির্ধারণ এবং ঘোষণার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কনটেইনারের সিল পরিবর্তনের অভিযোগ

সিআইসির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কাস্টমসের নজরদারি এড়াতে লক করা কনটেইনারের মূল সিল কেটে নতুন সিল লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল শুল্ক ফাঁকির আশঙ্কাই বাড়ায় না, বরং কাস্টমসের নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তবে এ ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত এবং কীভাবে কনটেইনারের সিল পরিবর্তন করা হয়েছে, তা নির্ধারণে তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রয়োজন।

কম শুল্কের ঘোষণায় উচ্চমূল্যের মোটরপার্টস

কাস্টমস সূত্র জানায়, এমএসটি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে আমদানি করা আরও কয়েকটি চালানেও ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের অসংগতি পাওয়া গেছে।

‘এইচ আর এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিন রাবার বুশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে প্রায় ১৩ টন ওজনের বিভিন্ন দামি মোটরপার্টস খালাসের চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষায় ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিং-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে সূত্র।

অন্যদিকে, ‘নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান চীন থেকে ২৩ টন হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দিয়ে প্রায় সাড়ে ২১ টন ফ্লেক্স ব্যানার খালাসের চেষ্টা করে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব চালানের অনিয়মের বিষয়ে তদন্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, এমএসটি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে পরিচালিত চালানে লক দেওয়া কিংবা কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে অনেক কর্মকর্তা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন। তাঁদের দাবি, প্রভাবশালী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কারণে তদন্ত ও পরীক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এমনকি সিআইসির অভিযানে সংশ্লিষ্ট চালান আটকের পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বদলি বা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় কাস্টম হাউসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তার চেয়ারে বসে ফাইল স্বাক্ষরের বিতর্ক

এস এম সাইফুল আলমকে ঘিরে আরেকটি বিতর্কের সূত্রপাত হয় সরকারি ছুটির দিনে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে প্রবেশ এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা এক রাজস্ব কর্মকর্তার চেয়ারে বসে ফাইল স্বাক্ষরের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ঘটনায়।

এ নিয়ে কাস্টমসের অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। একজন বেসরকারি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কীভাবে সরকারি কর্মকর্তার দাপ্তরিক চেয়ারে বসে ফাইল স্বাক্ষর করেন এবং এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

অভিযোগ অস্বীকার এস এম সাইফুল আলমের

অভিযোগের বিষয়ে এস এম সাইফুল আলম বলেন, কাফ করপোরেশনের মালিককে তিনি চেনেন না। সংশ্লিষ্ট চালানের কাজ তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে করা হলেও ওই সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন।

কনটেইনারের লক পরিবর্তনের বিষয়ে তাঁর দাবি, পরীক্ষার জন্য প্রথমে কনটেইনার খোলা হয়েছিল। পরে কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবগতিতে নতুন লক লাগানো হয়। তবে সিআইসির পক্ষ থেকে লক পরিবর্তনের ঘটনাকে জালিয়াতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারি কর্মকর্তার চেয়ারে বসে ফাইল স্বাক্ষরের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।

কমিশনারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহা. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরবর্তী সময়ে খুদে বার্তার মাধ্যমে অভিযোগগুলো তাঁর নজরে আনা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

তদন্ত ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

একাধিক চালানে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য, শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ, নিষিদ্ধ পণ্য আমদানির চেষ্টা এবং কনটেইনারের সিল পরিবর্তনের মতো বিষয় সামনে আসায় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নজরদারি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট চালানের নথি যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। একই সঙ্গে কাস্টমসের কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে।

 

সর্বশেষ - জেলার খবর