মাহফুজা মিম : ইতিহাসের ধুলো জমা পাতা উল্টালে দেখা যায়, যুদ্ধ মানেই কেবল বারুদ আর অস্ত্রের গর্জন নয়। অনেক সময় একটি দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার জন্য কোনো কামানের গোলার প্রয়োজন হয় না।
শুধু তার সমুদ্রপথ আটকে দেয়াই যথেষ্ট। গ্রিসের সে প্রাচীন নগররাষ্ট্র থেকে শুরু করে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সবখানেই সমুদ্র অবরোধ বা ‘ব্লকেড’ ছিল যুদ্ধের অন্যতম মোক্ষম অস্ত্র।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে ঘিরে যে উত্তজনা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের সে শত বছরের পুরনো ইতিহাসের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা একে বলছেন এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’, যার লক্ষ্য হলো শত্রুকে অনাহারে রেখে বা তার কোষাগার শূন্য করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা বহু পুরনো। তাই প্রতিপক্ষের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া মানে তার অর্থনীতির শ্বাসরোধ করা। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের সমুদ্রপথ আটকে দেয়া সরাসরি যুদ্ধের শামিল। কিন্তু মজার ব্যাপার বিশ্বরাজনীতির মারপ্যাঁচে দেশগুলো একে সরাসরি ‘অবরোধ’ না বলে কখনো ‘নিষেধাজ্ঞা’, কখনো ‘এমবারগো’ আবার কখনো ‘কোয়ারেন্টাইন’ বা ‘সঙ্গনিরোধ’ বলে আখ্যায়িত করে। যেমন ১৯৬২ সালে কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যখন সোভিয়েত জাহাজ আটকাতে চাইলেন, তিনি তখন একে ‘আ স্ট্রিক্ট কোয়ারেন্টাইন’ বা ‘কঠোর সঙ্গনিরোধ’ হিসেবে নামকরণ করেছিলেন। বর্তমানে লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষকরা হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে ‘ডাবল ব্লকেড’ বা ‘দ্বিমুখী অবরোধ’ হিসেবে দেখছেন।
সমুদ্রপথ আটকে দিয়ে যুদ্ধ জয়ের কৌশল আজ থেকে হাজার বছর আগেও কার্যকর ছিল। প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টা যখন এথেন্সের শস্য আমদানির পথ বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন শক্তিশালী এথেন্সও মাথা নত করতে বাধ্য হয়। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের দম্ভ চূর্ণ করার পেছনেও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধের বড় ভূমিকা ছিল। নেপোলিয়ন নিজেও কম যাননি। তিনি ইউরোপের বাজারে ব্রিটিশ পণ্য ঢোকা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন, যাতে ব্রিটেন ব্যবসায়িকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময়ও উত্তর ও দক্ষিণ উভয় পক্ষই একে অন্যের বাণিজ্যপথ বন্ধ করতে জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্লকেডের ধরন কিছুটা বদলে যায়। তখন জার্মানি ও ব্রিটেন একে অন্যের কেবল বাণিজ্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের পেটের ভাত অর্থাৎ খাদ্য সরবরাহ বন্ধের নেশায় মেতে ওঠে। জার্মানি তার সাবমেরিন দিয়ে ব্রিটেনের খাদ্যবাহী জাহাজ ডোবাতে থাকে। পাল্টা জবাবে ব্রিটেনও জার্মানিকে এমনভাবে কোণঠাসা করে যে খোদ জার্মানি ক্ষুধার্ত হওয়ার উপক্রম হয়। মজার বিষয় জার্মানি কৃষিকাজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কেন অনাহারে পড়ল? এর কারণ ছিল মানুষের চেয়েও বেশি ঘোড়া ও কৃষককে ফসলের মাঠ থেকে ধরে রণক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। এ ভারসাম্যহীনতার সুযোগটাই নিয়েছিল ব্রিটিশ অবরোধ।
আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সমুদ্রপথে তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়। জাপান যে সম্পদসমৃদ্ধ এশীয় অঞ্চল দখল করতে চেয়েছিল, তার অন্যতম কারণই ছিল এ জ্বালানি সংকট। অর্থাৎ নৌ-অবরোধ কখনো কখনো যুদ্ধের কারণও হয়ে উঠেছে।
আমাদের নিজেদের ইতিহাসেও এমন অবরোধের বড় প্রভাব রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারত যখন পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরগুলো অবরোধ করে ফেলে, তখন পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে যায়। রসদ ও সৈন্য আসার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। আবার ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যখন হাইফং বন্দরে মাইন পেতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, তখনই উত্তর ভিয়েতনাম শান্তি আলোচনায় বসতে নমনীয় হয়েছিল।
ইতিহাসের এ উদাহরণগুলোই প্রমাণ করে সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, যুদ্ধের শেষ হাসি সাধারণত সে রাষ্ট্রই হাসে।
বর্তমান বিশ্বে ব্লকেড বা অবরোধের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। তবে বর্তমানের সবচেয়ে বড় ‘অবরোধ’ অস্ত্রটি হলো ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থা থেকে কাউকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া। তাই যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরান, উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন তারা কার্যত আধুনিক এক ধরনের অদৃশ্য অবরোধের শিকার হয়।
২০১৭ সালে কাতার যখন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরের রোষানলে পড়েছিল, তখন তারা জল, স্থল ও আকাশপথ—তিনদিক থেকেই অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবার ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের বর্তমান নিয়ন্ত্রণও সে পুরনো পেশিশক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমানে এ ‘ব্লকেড’ কৌশল আবারো আলোচনায় এসেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পদক্ষেপে সেখানে কার্যত ‘দ্বৈত অবরোধ’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরান জাহাজে হামলা চালিয়ে পথ অচল করতে চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনৈতিক প্রবাহ থামাতে উদ্যোগী।
অবরোধ যেমন শত্রুকে দুর্বল করে, তেমনি এর নেতিবাচক ঝুঁকিও ব্যাপক। হরমুজ প্রণালিতে যদি ইরানের তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার প্রভাব চীন ও ভারতের মতো এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোয় পড়বে। সেক্ষেত্রে চীন সরাসরি এ উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ঠিক যেমন মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের তুলা আমদানিতে টান পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম অ্যালিসন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কূটনীতি এড়িয়ে অবরোধ বা ব্লকেডকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তবে চীনও তাইওয়ানের ক্ষেত্রে একই কৌশল প্রয়োগ করতে পারে।
সব মিলিয়ে সমুদ্রপথ অবরোধ এক পুরনো কৌশল হলেও আজও তার কার্যকারিতা অক্ষুণ্ন। এটি কখনো যুদ্ধ জিতিয়েছে, কখনো বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়েছে, আবার কখনোবা নতুন সংঘাতেরও জন্ম দিয়েছে। ইতিহাস বলছে, নৌ-অবরোধ শুধু সমুদ্রের পানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি থামিয়ে দিতে পারে একটি দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, এমনকি বৈশ্বিক ভারসাম্যও। তাই সমুদ্রের জলরেখায় যে অবরোধ তৈরি হয়, তার ঢেউ আছড়ে পড়বে সারা বিশ্বেই।
লেখক : সহসম্পাদক, বণিক বার্তা

















