Sunday , 13 September 2026 |
  1. অপরাধ
  2. অপরাধচিত্র বিশেষ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. কক্সবাজার
  7. কিশোরগঞ্জ
  8. কুড়িগ্রাম
  9. কুমিল্লা
  10. কুষ্টিয়া
  11. কৃষি ও প্রকৃতি
  12. ক্রীড়াঙ্গন
  13. খুলনা
  14. খেলাধুলা
  15. গাইবান্ধা

আন্তর্জাতিক স্ক্যামারদের নতুন ঠিকানা বাংলাদেশ!

প্রতিবেদক
Newsdesk
September 13, 2026 10:39 am

অপরাধচিত্র র্রিপোর্ট: বাইরে থেকে সাধারণ আবাসিক ভবন। দরজায় নেই কোনো প্রতিষ্ঠানের নামফলক। ভেতরে ঢুকলেই বদলে যায় দৃশ্য সারি সারি ল্যাপটপ অসংখ্য স্মার্টফোন দ্রুতগতির ইন্টারনেট আর একাধিক যোগাযোগ ডিভাইস। দেখলে মনে হবে কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অফিস। অথচ অভিযোগ এসব জায়গা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা জুয়া ও অর্থ পাচারের কার্যক্রম

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনেছে—বাংলাদেশের মাটিতে কি আন্তর্জাতিক স্ক্যামারদের নতুন ঘাঁটি তৈরি হচ্ছে?
চট্টগ্রামের খুলশীতে একটি অভিযানে ৬৩ বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় তদন্তকারীরা এমন একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছেন, যার সঙ্গে অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল প্রতারণার যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হয়েছে বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস।

ঘাঁটি বদলেছে, ফাঁদ বদলায়নি

এশিয়ার কয়েকটি দেশে অনলাইন স্ক্যাম ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো নতুন অপারেশনাল জায়গা খুঁজছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক তদন্তে।
বাংলাদেশের বড় শহর ও পর্যটনকেন্দ্রগুলো তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ—সহজ ইন্টারনেট, ব্যাপক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ভাড়া বাসায় দ্রুত সেটআপ করার সুযোগ এবং ডিজিটাল অপরাধের ক্ষেত্রে আন্তঃদেশীয় তদন্তের জটিলতা।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ঝুঁকিকে আরও দৃশ্যমান করেছে। কক্সবাজারে একটি অভিযানে ছয় বিদেশি নাগরিকের কাছ থেকে প্রায় দুই হাজার আইফোন ও কয়েক ডজন ল্যাপটপ উদ্ধারের তথ্যও সামনে এসেছে।

একজন নয়, টার্গেট পুরো শ্রেণি:

এই চক্রগুলোর শিকার শুধু প্রযুক্তিতে অদক্ষ মানুষ নন।
ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার, অনলাইন উদ্যোক্তা, চাকরিপ্রার্থী এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় সাধারণ মানুষও তাদের টার্গেটে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।প্রথমে আসে পরিচয়।তারপরবন্ধুত্ব।এরপর বিশ্বাস।সবশেষে আসে টাকা।

কখনো বলা হয়—বিদেশে চাকরি নিশ্চিত। কখনো—স্বল্প সময়ে বড় মুনাফার বিনিয়োগ। আবার কখনো অনলাইন ব্যবসা বা ডিজিটাল মুদ্রায় লাভের গল্প শুনিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী যখন বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার, তখন প্রতারকের পরিচয়, নম্বর কিংবা অর্থের গন্তব্য—সবই অদৃশ্’ থেকে ‘বিনিয়োগের ফাঁদ’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; প্রতারকদের কাছেও এটি সম্ভাব্য শিকার খোঁজার বড় ক্ষেত্র।
ভুয়া ছবি, সাজানো জীবনযাপন, বিদেশি পরিচয় কিংবা আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক প্রোফাইল ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়।

উদ্দেশ্য একটাই—বিশ্বাস অর্জন।

বিশ্বাস তৈরি হওয়ার পর আসে জরুরি টাকা, বিনিয়োগ, উপহার ছাড়ানোর খরচ, বিদেশে চাকরির প্রসেসিং ফি কিংবা অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশনের নামে অর্থ দাবি।

ক্লিকে ফাঁকা হতে পারে অ্যাকাউন্ট:

সাইবার প্রতারণার আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো ফিশিং।
ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো লিংকে ক্লিক করানো হয়। এরপর ব্যবহারকারীর তথ্য হাতিয়ে নেওয়া বা ডিভাইসে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়।
অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য ব্যবহার করে শুরু হতে পারে ব্ল্যাকমেল।
অর্থাৎ প্রতারণা এখন শুধু টাকা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—মানুষের ডিজিটাল পরিচয়ও হয়ে উঠেছে অপরাধীদের পণ্য।
বাংলাদেশি ‘সহযোগী’ ছাড়া এত বড় নেটওয়ার্ক সম্ভব?
আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এখানেই।
বিদেশি নাগরিকরা দেশে বসে অপরাধ করলেও তাদের স্থানীয় সহায়তা ছাড়া দীর্ঘদিন কার্যক্রম চালানো কঠিন।
বাসা ভাড়া, সিম সংগ্রহ, ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট, অর্থ গ্রহণ, প্রযুক্তি সরবরাহ কিংবা স্থানীয় যোগাযোগ—প্রতিটি স্তরেই দেশীয় সহযোগীদের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই শুধু বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার করলেই তদন্ত শেষ হওয়ার সুযোগ নেই। বের করতে হবে—তাদের স্থানীয় সহযোগী কারা, টাকা কার অ্যাকাউন্টে গেছে এবং সেই টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছেছে।

টাকার পথই খুলবে পুরো রহস্য:

সাইবার প্রতারণার টাকা সাধারণত একটি অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকে না—তদন্তে এমন প্রবণতাই বেশি দেখা যায়।
এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক অ্যাকাউন্টে দ্রুত স্থানান্তর, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার এবং পরবর্তী সময়ে অনানুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ সরানোর চেষ্টা করা হতে পারে।
এখানেই তদন্তকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘মানি ট্রেইল’।কে টাকা পাঠালেন?কার অ্যাকাউন্টে গেল?
সেখান থেকে কোথায় গেল? শেষ পর্যন্ত অর্থের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
এই চার প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে একটি আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের পুরো কাঠামো উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের ঘটনা কি বড় নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত?
কক্সবাজারে বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক আইফোন ও ল্যাপটপ উদ্ধারের ঘটনায় ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব ডিভাইসের ব্যবহার ও সংশ্লিষ্টতার বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই চট্টগ্রামে আরও বড় অভিযানে ৬৩ বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তারের ঘটনা সামনে আসে। পুলিশ বলছে, তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা হলে কার সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ ছিল এবং প্রতারণার পরিধি কতটা বিস্তৃত—তা স্পষ্ট হতে পা-


অর্থাৎ, ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি—‘সাবস্টেশন’ ছড়িয়ে পড়া
একটি জায়গায় অভিযান হলে চক্রটি অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে।
আজ চট্টগ্রাম, কাল কক্সবাজার; এরপর ঢাকার অভিজাত এলাকা কিংবা অন্য কোনো পর্যটন শহর—এভাবেই ছোট ছোট অপারেশনাল সেল তৈরি করা সম্ভব।
একটি বড় সার্ভার বা অফিসের প্রয়োজন নেই। কয়েকটি ল্যাপটপ, বহু মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং দক্ষ অপারেটর দিয়েই একটি ছোট স্ক্যাম সেন্টার চালানো সম্ভব।
এই কারণেই সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু একটি চক্র ধরা পড়া নয়; বরং একই মডেলে আরও কতটি চক্র দেশের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহীনির নতুন চ্যালেঞ্চ

সাম্প্রতিক অভিযানগুলো দেখিয়ে দিয়েছে বিদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে সংঘটিত সাইবার অপরাধ এখন আর কেবল অনলাইন পুলিশের বিষয় নয়

এখানে যুক্ত হচ্ছে ইমিগ্রেশন আর্থিক গোয়েন্দা ব্যাংকিং ব্যবস্থা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস সাইবার ফরেনসিক এবং আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা।

একজন বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর তিনি কোথায় থাকছেন, কী কাজ করছেন, তার সঙ্গে কার যোগাযোগ, কী ধরনের আর্থিক লেনদেন হচ্ছে—এসব তথ্যের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে অপরাধী শনাক্ত হলেও পুরো নেটওয়ার্ক ধরা কঠিন।

গ্রেপ্তারই শেষ কথা নয়:

চট্টগ্রামে ৬৩ বিদেশি গ্রেপ্তারের ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ফরেনসিক ও আর্থিক তদন্ত।
কারণ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা যদি কেবল একটি ‘সেল’-এর সদস্য হন, তাহলে মূল হোতারা হয়তো দেশের বাইরে অবস্থান করছে।
আবার তাদের সঙ্গে যুক্ত দেশীয় সহযোগীরা যদি শনাক্ত না হন, তাহলে একই নেটওয়ার্ক নতুন সদস্য নিয়ে আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে।

অপরাধচিত্রের প্রশ্ন:

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের তৎপরতা নতুন কোনো বিষয় নয়। নতুন বিষয় হলো—অপরাধের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
তাই এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে—
দেশে কতটি বিদেশি সাইবার সেল সক্রিয়?
তাদের স্থানীয় সহযোগী কারা?
প্রতারণার টাকা কোন কোন অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে?
কতজন বাংলাদেশি ইতোমধ্যে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সর্বস্ব হারিয়েছেন?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক স্ক্যামারদের জন্য কেবল একটি ট্রানজিট পয়েন্ট, নাকি ধীরে ধীরে স্থায়ী অপারেশনাল হাবে পরিণত হচ্ছে?
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সাম্প্রতিক অভিযানগুলোর তদন্ত শেষ হলে হয়তো এই প্রশ্নগুলোর অনেক উত্তরই সামনে আসবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সাইবার অপরাধ এখন আর পর্দার আড়ালে থাকা বিচ্ছিন্ন প্রতারণা নয়; এটি হয়ে উঠছে সীমান্ত পেরোনো সংঘবদ্ধ অপরাধের নতুন অবকাঠামো।

সর্বশেষ - জেলার খবর