Monday , 21 September 2026 |
  1. অনিয়ন ও দুর্নীতি
  2. অপরাধ
  3. অপরাধচিত্র বিশেষ
  4. অর্থনীতি
  5. আইন-আদালত
  6. আন্তর্জাতিক
  7. কক্সবাজার
  8. কিশোরগঞ্জ
  9. কুড়িগ্রাম
  10. কুমিল্লা
  11. কুষ্টিয়া
  12. কৃষি ও প্রকৃতি
  13. ক্রীড়াঙ্গন
  14. খুলনা
  15. খেলাধুলা

নিখোঁজ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় প্রশ্নের মুখে নিরাপদ শৈশব

প্রতিবেদক
Newsdesk
September 21, 2026 10:30 am

নিজস্ব প্রতিবেদক: একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা তার পরিবার। কিন্তু বাস্তবতার কিছু নির্মম ঘটনা সেই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কখনো ঘরের ভেতর, কখনো পরিচিত মানুষের আশপাশে, আবার কখনো বাইরে বের হয়ে—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, এমনকি প্রাণও হারাচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, শিশুদের নিরাপত্তা এখন শুধু অপরাধপ্রবণ এলাকা বা অপরিচিত মানুষের বিষয় নয়। পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি এবং আইন প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই শিশু সুরক্ষার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

আট মাসের হিসাবেই ভয়াবহ চিত্র:

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর লাশ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ৮১টি মামলা হয়েছে। নিহত শিশুদের মধ্যে ৬৮ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার এবং ৪৯ জন শারীরিক নির্যাতনের পর নিহত হয়েছে বলে পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিখোঁজ হওয়ার পর লাশ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ শিশুর।
বয়সের হিসাবে সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোর। এ বয়সী নিহতের সংখ্যা মোটের প্রায় ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী ৭৪ শিশু এবং সাত থেকে ১২ বছর বয়সী ৬০ শিশুও প্রাণ হারিয়েছে।
অর্থাৎ ঝুঁকি শুধু কিশোরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একেবারে ছোট শিশুরাও বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

নিখোঁজ ১৫ হাজারের বেশি শিশু:

শিশু নিরাপত্তার আরেকটি বড় উদ্বেগ নিখোঁজের ঘটনা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে।
এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বেশি নিখোঁজ হয়েছে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোর। এ বয়সী নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ২৪৩টি জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা গেলেও ১ হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ।
শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ৪৭৪টি। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তবে ৬৮ জনের সন্ধান মেলেনি।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা?:

পুলিশের বিশ্লেষণে ছোট শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে পথ হারিয়ে ফেলা, অপরিচিত এলাকায় গিয়ে পরিবারের পরিচয় বা ঠিকানা বলতে না পারা এবং একা চলাচলের মতো কারণ উঠে এসেছে।
কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। পারিবারিক অশান্তি, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের প্রভাব, স্বাধীনভাবে চলার আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক বা ব্যক্তিগত সংকটসহ বিভিন্ন কারণ তাদের বাড়ি ছাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নিখোঁজ হওয়ার কারণ যাই হোক, প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত শনাক্তকরণ ও উদ্ধারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

শুধু নিখোঁজ নয়, বাড়ছে সহিংসতার ঘটনাও:

পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যানেও নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে মাসভিত্তিক মামলার সংখ্যা ছিল জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮১, মার্চে ১ হাজার ৪৮৫, এপ্রিলে ২ হাজার ১১, মে মাসে ১ হাজার ৯৫২, জুনে ২ হাজার ২০০, জুলাইয়ে ২ হাজার ৩৩৬ এবং আগস্টে ২ হাজার ১৫৬।
পরিসংখ্যান বলছে, বছরের মাঝামাঝি সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা কয়েক মাসে দুই হাজারের ওপরে উঠেছে।

ঘরের কাছেই যখন বিপদ:

সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছরের তিন শিশুকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। পাবনায় নিখোঁজ হওয়ার পর চতুর্থ শ্রেণির এক শিশুর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনাতেও শিশু-কিশোরী নিহত হয়েছে। রংপুরে একটি পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনায় ১২ বছরের এক শিশুও প্রাণ হারিয়েছে। মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর লাশ উদ্ধারের কয়েকদিন পর নদী থেকে তাঁর এক বছর বয়সী সন্তানের লাশ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটে।
ঘটনাগুলো আলাদা হলেও একটি বিষয় অভিন্ন—শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি বারবার সামনে আসছে।

প্রযুক্তির জগতেও নতুন ঝুঁকি:

শিশুর নিরাপত্তার আলোচনায় এখন আর শুধু রাস্তা, স্কুল কিংবা পরিবারকে বিবেচনায় নিলে হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শিশুদের সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিভাবকদের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি সম্পূর্ণ নজরদারিহীন অনলাইন ব্যবহারও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বয়স উপযোগী ডিজিটাল শিক্ষা, অভিভাবকের সচেতনতা এবং নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবেশ জরুরি।

সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান:

শিশু অধিকার ও নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক একটি সূচকে ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৩তম। ওই সূচকে শিশুদের জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং অধিকার বাস্তবায়নের পরিবেশ—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে মোট ২৩টি সূচক বিবেচনা করা হয়েছে।
একই তালিকায় ভারতের অবস্থান ৯৬ এবং পাকিস্তানের ১৫৫। গ্রিস তালিকার শীর্ষে এবং আফগানিস্তান সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে।
তবে কোনো একটি আন্তর্জাতিক সূচক দিয়ে একটি দেশের শিশু নিরাপত্তার পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ করা যায় না। স্থানীয় অপরাধের ধরন, আইন প্রয়োগ, সামাজিক বাস্তবতা এবং শিশুদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থাকেও পাশাপাশি বিবেচনায় নিতে হয়।

নিরাপদ শৈশবের দায়িত্ব কার?:

শিশু সুরক্ষায় পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দায়িত্ব শুধু বাবা-মায়ের নয়। শিশুর চলাফেরা, বন্ধুত্ব, মানসিক পরিবর্তন ও অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্যাতন বা হত্যার ঘটনায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য সহিংসতামুক্ত সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে স্থানীয় পর্যায়েও উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর শুধু একটি পরিবার অপেক্ষায় থাকে না—একটি সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থাও তখন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
শিশুর জন্য নিরাপদ ঘর, নিরাপদ স্কুল, নিরাপদ রাস্তা এবং নিরাপদ অনলাইন জগৎ—চারটিই নিশ্চিত করা না গেলে ‘নিরাপদ শৈশব’ কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
এবার এটি মূল প্রতিবেদনের কপি-ধাঁচে নয়, বরং “শিশুর নিরাপত্তা কোথায় ভাঙছে”—এই অনুসন্ধানী অ্যাঙ্গেল ধরে নতুন করে সাজানো হয়েছে।

সর্বশেষ - জেলার খবর