অপরাধচিত্র ডেস্ক: দেশে কর্মসংস্থানের সংকটকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন চাকরি প্রতারকচক্র। দেশি-বিদেশি পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম, লোগো ও ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়ে এরা চাকরিপ্রার্থীদের সহজ শিকারে পরিণত করছে।
প্রথমে সহজ কাজ ও মোটা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়। পরে নিবন্ধন, বিনিয়োগ, পণ্য কেনা কিংবা টাস্ক সম্পন্নের নামে ধাপে ধাপে টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা। শেষ পর্যন্ত চাকরি বা মুনাফা কোনোটিই না পেয়ে অর্থ হারাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে বিভিন্ন লিংকে ক্লিক করিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেও অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এই সংঘবদ্ধ চক্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারকরা ফেসবুকে নানা ধরনের পেজ থেকে বিজ্ঞাপন, মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস, ভুয়া ওয়েবসাইট এবং কল সেন্টারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে। কল সেন্টারের পেশাদার কর্মীর মতো কথা বলে তারা ভুক্তভোগীর আস্থা অর্জন করে। এ ছাড়া বুস্টিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণা চালায়, যাতে সহজেই বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে তারা।
এ ধরনের প্রতারণার শিকার হন কলাবাগানের বাসিন্দা আতিকুর রহমান।
থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) তিনি উল্লেখ করেন, চাকরির নামে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে অনলাইনে কাজ করে মাসে বিপুল অর্থ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে ‘tkshop689.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটে যুক্ত করা হয়। গত ১ থেকে ২২ মে পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে ধাপে ধাপে তিনি ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ৬২৫ টাকা জমা দেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত লাভ কিংবা মূলধনের কোনো অংশই ফেরত পাননি। ৫ জুন আরো চার লাখ ৪০ হাজার টাকা বিনিয়োগের দাবি করা হলে তিনি প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে আর অর্থ দেননি। পরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
ফেসবুকে দারাজের নামে অনলাইন চাকরির প্রলোভনে নাহিদা আক্তার নামের এক গৃহিণীর ৭২ হাজার টাকা খোয়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর মুগদা থানায় করা জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘Daraz-CS’ নামে একটি পেজে ঘরে বসে অনলাইন কাজের বিজ্ঞাপন দেখে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে প্রতারকচক্র তাঁকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে দেয় এবং টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করে। প্রথম দিকে কিছু লেনদেন স্বাভাবিক থাকলেও পরে বিভিন্ন পণ্য কেনার কথা বলে ধাপে ধাপে বিকাশের একাধিক নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হয়। গত ২১ ও ২২ মে বিভিন্ন সময়ে তিনি মোট আটটি লেনদেনে ৭২ হাজার ২২৯ টাকা পাঠান। এরপর আরো টাকা দাবি করলে তাঁর সন্দেহ হয় এবং টাকা ফেরত চাইলে প্রতারকরা তা না দিয়ে নানা অজুহাত দেখাতে থাকে।
মামলা-জিডিতে আগ্রহ কম : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলছে, চাকরির নামে অনলাইন প্রতারণার ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও বেশির ভাগ ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে চান না। এতে অনেক ঘটনাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে এবং প্রতারকচক্র আরো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
ভুক্তভোগী অনিল সরকার বলেন, “ফেসবুকে ‘রকমারি’ নামে একটি পেইজে ‘দারাজে’ ঘরে বসে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে নিবন্ধন করি। পরে আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে যুক্ত করে বিভিন্ন কাজ করানো হয়। শুরুতে কাজের বিপরীতে ৩০০ টাকা দেয়। পরে কাজের পাশাপাশি ৩০০ টাকা বিনিয়োগ করে এক হাজার ৩৫০ টাকা পাই। এরপর বিনিয়োগের কথা বলে তিন হাজার টাকা নিয়ে নেয় প্রতারকরা। কয়েক দিন পর আরো বিনিয়োগ করতে বললে সন্দেহ হওয়ায় আর টাকা দিইনি। বিনিয়োগ করা টাকা ফেরত চাইলেও দেয়নি। এরপর তারা আমাকে গ্রুপ থেকে বের করে দেয়।” এ ঘটনায় অনিল থানায় অভিযোগ করেননি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অল্প টাকার জন্য থানার ঝামেলায় যেতে চাননি।
বাইনান্স ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থপাচার : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অনলাইন প্রতারকদের নিয়মিত গ্রেপ্তার করলেও তাঁরা জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়ায় বলে মন্তব্য করেছেন গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) উপকমিশনার (ডিসি) তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে চাকরি, বিনিয়োগ ও সহজে অর্থ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র প্রতারণা করছে। প্রথমে অল্প লাভ দেখিয়ে আস্থা অর্জন করা হয়, পরে বিভিন্ন অজুহাতে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়।’ এ ধরনের বিজ্ঞাপন বা অফারে বিশ্বাস না করার পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের আগে প্রতিষ্ঠানটির সত্যতা যাচাই করার পরামর্শ দেন তিনি।
ডিসি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ প্রতারণার সঙ্গে আন্ত জেলা ও বিদেশভিত্তিক চক্র জড়িত। বিশেষ করে চীনা নাগরিকদের সহায়তা বেশি নেয় প্রতারকরা। আমরা অনেক চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার করেছি। অনলাইন জুয়া, বাইনান্স ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে এই টাকা বিদেশে পাচার করছে।’ তিনি আরো জানান, প্রতারণার অর্থ সরিয়ে নিতে ‘মানি মিউল অ্যাকাউন্ট’ ব্যবহার করা হয়। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতারণার অর্থ এক ব্যক্তি বা স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।
বেকারত্ব বাড়াচ্ছে প্রতারণার ঝুঁকি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে চাকরিপ্রত্যাশীরা অনলাইনের লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞাপনে সহজেই আগ্রহী হন। প্রতারকরা এই অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে নিবন্ধন, পরে বিনিয়োগের নামে টাকা হাতিয়ে নেয়।’
তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান বাড়ানো না গেলে এ ধরনের প্রতারণা কমানো কঠিন হবে।’
ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে চাকরিপ্রত্যাশীরা অনলাইনের লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞাপনে সহজেই আগ্রহী হন। প্রতারকরা এই অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে নিবন্ধন, পরে বিনিয়োগের নামে টাকা হাতিয়ে নেয়।’
তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান বাড়ানো না গেলে এ ধরনের প্রতারণা কমানো কঠিন হবে।’


















