অপরাধচিত্র ডেস্ক:
সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকের কাছ থেকে বোরো ধান কেনার কথা। কিন্তু মাগুরার মহম্মদপুরে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহে অনিয়ম হচ্ছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি না কিনে একটি চাতালকলের মালিকের সঙ্গে চুক্তি করে তাঁর গুদামে ধান রাখা হয়েছে। এ জন্য প্রতি টনে নেওয়া হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা।
এ ছাড়া সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার জন্য তৈরি করা কৃষকের তালিকায় দরিদ্র, ভূমিহীন, দিনমজুরসহ অকৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে। এসব ব্যক্তির নামে ধান দেখিয়ে একটি চক্র সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ফলে প্রকৃত কৃষকরা সরকারি দামে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মহম্মদপুরে চলতি বোরো মৌসুমের সরকারি ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয় গত ২৩ মে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা এবং অনুমোদিত মিলারের কাছ থেকে সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা দরে কেনার কথা।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, মহম্মদপুর উপজেলায় কৃষকের কাছ থেকে ৭০০ টন ধান সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ মৈমুর আলী মৃধাকে। তিনি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে সরকারি খাদ্যগুদামে জমা না দিয়ে মহম্মদপুরের একটি চাতালকলের মালিক বাকী মেম্বারের সঙ্গে চুক্তি করেন। এরপর ওই চাতাল মালিকের গুদামে ধান রাখা হয়। এভাবে ধান রাখার বিনিময়ে প্রতি টনে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয় মৈমুরকে। এতে প্রকৃত কৃষকরা সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ধান সংগ্রহের নামে প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে ব্যবসায়ী বা মিলারদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হলে, বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শুধু মাগুরার মহম্মদপুরে নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী ও মিলাররা কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করছেন। এতে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হলেও লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ী ও মিলার।
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে গুদামে বস্তা সংকটের কথা বলে কৃষকদের ধান না নিয়ে একটি অটো রাইস মিলে সরবরাহের জন্য টোকেন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুই কৃষক এ বিষয়ে উপজেলা খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তাদের একজনের অভিযোগ, রাইস মিলে ধান দেওয়ার সময় কোনো সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর কাছ থেকে তিন বস্তা ধান কর্তন করা হয়েছে, যার দাম দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পাওয়ার পর রাজারহাট উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে।
বান্দরবানের লামায়ও সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষক ফখরুল ইসলাম। তাঁর দাবি, কৃষি কার্ডে পাঁচ একর জমিতে ধান চাষের তথ্য থাকার পরও গুদামে ধান নেওয়া হয়নি। বস্তার সংকটের কথা বলে তাঁকে বারবার অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরে বাড়িতে রাখা ধানের একটি অংশ বন্যার পানিতে নষ্ট হয়।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে অনিয়ম ও ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে খাদ্যগুদামের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষকের কাছ থেকে ধান নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ দাবি করা এবং প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ দেখানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে সরকারি ধান সংগ্রহের তালিকায় প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে ভূমিহীন, দিনমজুর ও দরিদ্র ব্যক্তিদের নাম ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি সুবিধা দেওয়ার কথা বলে ব্যাংক হিসাব খোলা হয় এবং পরে তাদের নামে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ দেখানো হয়। বিনিময়ে তাদের সামান্য অর্থ দেওয়া হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বোরো মৌসুমে সরকার মোট ১৮ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে পাঁচ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং এক লাখ টন আতপ চাল রয়েছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার টন গমও সংগ্রহ করার কথা।
গত ৩ মে থেকে সারাদেশে এ সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে; চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা। সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা দরে কেনা হচ্ছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৫ লাখ ৫৫ হাজার ৩৭২ টন বোরো ধান-চাল সংগ্রহ হয়েছে। এর মধ্যে ধান পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩০ টন, সেদ্ধ চাল ১০ লাখ ৯২ হাজার ১৪৭ টন এবং আতপ চাল ৮৮ হাজার ৬৭৩ টন। এ সময় পর্যন্ত গম সংগ্রহ হয়েছে ৫২৩ টন।
মাঠপর্যায়ে ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মু. জসীম উদ্দিন খান বলেন, সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং কৃষকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য খাদ্য অধিদপ্তরে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রয়েছে।


















