নিজস্ব প্রতিবেদক (খুলনা) : খুলনার দৌলতপুর এলাকায় অনুমোদনহীন ও রহস্যজনক সমবায় সমিতির আড়ালে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। ‘স্বপ্নধারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লি:’ নামক এই কথিত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়া পরিচালিত এই সমিতির মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে যেকোনো সময় উধাও হয়ে যেতে পারে পরিচালনাকারীরা।
সাইনবোর্ড সর্বস্ব অফিস, নেপথ্যে রহিম শিকদার : অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনা দৌলতপুরের ৮২৩/১৩, আপার যশোর রোডস্থ হাজী শরীয়ত উল্লাহ মার্কেটে অফিস খুলে বসেছে ‘স্বপ্নধারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লি:’। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন মো: আ: রহিম শিকদার নামের এক ব্যক্তি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা বা সমবায় অধিদপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে তারা এই এলাকায় ‘সমবায়’ শব্দটি ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছেন।

মাঠপর্যায়ে নারী কর্মীদের ব্যবহার: অভিনব প্রচারণা : অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতে এবং অতি মুনাফার লোভ দেখিয়ে মাঠপর্যায়ে একদল নারী কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, দিঘলিয়া বারাকপুরের মিস সুমি খাতুন, আড়ংঘাটার সিনথিয়া আক্তার মাহি, খালিশপুরের মরিয়ম খাতুন মিম এবং দিঘলিয়া সেনাটির সুমি খাতুনসহ বেশ কয়েকজন নারী কর্মী বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এই সমিতির নামে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা মূলত মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে মোটা অঙ্কের সঞ্চয় ও ডিপিএস সংগ্রহ করছেন।
আইন যা বলে: হতে পারে ৭ বছরের জেল : সমবায় সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সমবায় সমিতি আইন, ২০০১-এর ধারা ৯ (৪) অনুযায়ী, সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নামের সাথে ‘সমবায়’ (ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরাব) শব্দ ব্যবহার করতে পারবে না। এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ৭ (সাত) বছর কারাদণ্ড অথবা ন্যূনতম ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। নিবন্ধনহীন এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই আইন ও প্রতারণা মামলা প্রযোজ্য হতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য : এই বিষয়ে খুলনা জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো: জহিরুল ইসলাম অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন:
”সমবায় অফিসের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ‘সমবায়’ নাম ব্যবহার করলে আমরা নিয়ম অনুযায়ী তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
একই সুর শোনা গেছে উপজেলা সমবায় অফিসার খন্দকার জহিরুল ইসলামের কণ্ঠেও। তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন:
”সমবায় আইন অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। আমরা অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে যাচাই করছি। সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের আহ্বান—যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কষ্টার্জিত টাকা জমা দেওয়ার আগে অবশ্যই তাদের বৈধ কাগজপত্র ও সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধন নম্বর যাচাই করে নেবেন।”
তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার দাবি এলাকাবাসীর : স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এর আগেও বহু ভুঁইফোড় সমবায় সমিতি কোটি কোটি টাকা লোপাট করে চম্পট দিয়েছে। ‘স্বপ্নধারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি’র কার্যক্রমও একই রকম সন্দেহজনক। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বড় ধরনের কোনো আর্থিক জালিয়াতি ঘটার আগেই এই ‘স্বপ্নধারা’ সমিতির মূল হোতা আ: রহিম শিকদারসহ মাঠপর্যায়ের এজেন্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সমবায় অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

















