গার্ড অব অনার থেকে কবর খোঁড়া—১৭ ঘণ্টার অনিশ্চয়তা, পরিবারের অভিযোগ ও জামায়াতের পাল্টা বক্তব্য
পিরোজপুর প্রতিনিধি: একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা করা বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর দাফনকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান থেকে শুরু করে নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন—প্রতিটি পর্যায়েই দেখা দেয় অনিশ্চয়তা ও বিরোধের অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে মোবাইল ফোনের আলোয় পরিবারের নারী সদস্যদের কবর খোঁড়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় তাঁর দাফন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মৃত্যুর পর শনিবার দিবাগত রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতালিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
কেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান ও পারিবারিক কবরস্থানে দাফন নিয়ে বিরোধের নেপথ্যে কী ছিল? কারা বাধা দিয়েছিলেন—আর কারা অভিযোগ অস্বীকার করছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সামনে এসেছে পরিবারের বক্তব্য, প্রশাসনের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী দাবি।
প্রথমে কবর খোঁড়া, পরে ভরাট করার অভিযোগ:
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মানিক পশারীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর চিতালিয়া গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এ জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু বিকেলের দিকে কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলে কবরটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেন বলে অভিযোগ করেন স্বজনেরা।
মানিক পশারীর ছোট বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তারের বক্তব্য, প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর সেটি আবার ভরাট করে দেওয়া হয়। পরে রাতে তাঁরা আবার কবর খোঁড়েন। পুলিশ মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর পরিবারের নারী সদস্যরাই দাফনের জন্য মাটি কাটেন বলে তাঁর দাবি।
মেয়ে সুমি বেগমও জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের নিজেদের উদ্যোগেই বাবার দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। মোবাইল ফোনের আলোয় কবর খোঁড়ার ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
তবে কবর ভরাট করার ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাঁদের সবার পরিচয় এবং অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গার্ড অব অনার নিয়েও তৈরি হয় জটিলতা:
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার দুপুরে মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হলে গার্ড অব অনার প্রদান এবং তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে আপত্তি ওঠে। এ সময় স্থানীয় লোকজন ও জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতির কারণে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স পুলিশি নিরাপত্তায় পিরোজপুর পুলিশ লাইন্সে নেওয়া হয়। পরে সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় বলে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, মরদেহ নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। মানিক পশারীর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার পর বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরে পুলিশ লাইন্সে গার্ড অব অনার দেওয়া হলেও দাফনের স্থান ও ব্যবস্থা নিয়ে পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে।
তবে গার্ড অব অনার প্রদানে বিলম্বের পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি নাকি স্থানীয়দের আপত্তি—কোন বিষয়টি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিস্তারিত বক্তব্য ও নথি প্রয়োজন।
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে আপত্তি, জামায়াত নেতার দাবি:
পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে আপত্তি তুলে তাঁকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেছেন—এমন তথ্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর দাফন নিয়ে বাধার অভিযোগ তুলেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে কোনো পক্ষের আপত্তি থাকলে তা যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নাম গেজেটভুক্ত কি না, মুক্তিযোদ্ধা পরিচিতি নম্বর এবং সরকারি তালিকায় তাঁর অবস্থান যাচাই না করে কাউকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয়।
মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি প্রকাশ ও যাচাই করা প্রয়োজন।
সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা: বিরোধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা করেছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলা মামলায় মানিক পশারী রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন।
সাঈদীর বিরুদ্ধে ওই মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি মানিক পশারীর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে বিরোধের ঘটনায় এ অতীত আবারও আলোচনায় এসেছে।
তবে সাঈদীর মামলায় সাক্ষী হওয়াই দাফনে বাধা দেওয়ার কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ঘটনার ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা একা কারও দায় প্রমাণ করে না।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন যুক্ত ছিল। মরদেহ পুলিশ লাইন্সে নেওয়া, সেখানে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং পরে পুলিশি পাহারায় চিতালিয়া গ্রামে দাফন সম্পন্ন হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম দাফন সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্যেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে কয়েকটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো প্রয়োজন:
মরদেহ গ্রামে নেওয়ার পর দাফন নিয়ে আপত্তি কারা তুলেছিলেন এবং তাঁদের আপত্তির সুনির্দিষ্ট ভিত্তি কী ছিল?
প্রথমবার খোঁড়া কবর ভরাট করার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ কোনো তদন্ত করেছে কি না?
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মানিক পশারীর সরকারি স্বীকৃতি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না?
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিতে বিলম্ব হলে তার প্রশাসনিক কারণ কী ছিল?
পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে দাফন সম্পন্ন করার বিষয়ে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পুলিশ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কর্তৃপক্ষ, পরিবারের সদস্য এবং অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে তাঁদের বক্তব্য ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
দাফনে বাধার অভিযোগ অস্বীকার:
জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্য অনুযায়ী, দলীয়ভাবে দাফনে বাধা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, পরিবারের সদস্য ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্থানীয় জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ, ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ অংশে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। কারা সরাসরি বাধা দিয়েছেন, কে বা কারা কবর ভরাট করেছেন এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল—এসব বিষয় প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভিডিও, প্রশাসনিক নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ অস্বীকারের বিষয়টিও প্রতিবেদনে সমান গুরুত্বের সঙ্গে রাখা জরুরি। একইভাবে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে নিশ্চিতভাবে দায়ী করা উচিত নয়।
শেষ প্রশ্ন: একজন মুক্তিযোদ্ধার দাফন নিয়ে এমন পরিস্থিতি কেন?
একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহের মর্যাদা রক্ষা এবং পরিবারের ধর্মীয় ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সুযোগ নিশ্চিত করা মানবিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ। মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে সেটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে পরিবারের দাফন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার কারণ ও দায় নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মানিক পশারীর মৃত্যুর পর যা ঘটেছে, তা শুধু একটি পরিবারের ভোগান্তির ঘটনা নয়; এটি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিরোধ, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি, প্রশাসনের দায়িত্ব এবং নাগরিকের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

















