অপরাধচিত্র প্রতিনিধি (কুড়িগ্রাম) : কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় দখলকৃত স্কুলের রাস্তা উদ্ধার না করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি জবরদখল এবং নতুন রাস্তা নির্মাণের নামে জোরপূর্বক ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির দেড় লক্ষাধিক মূল্যের গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে ইউএনও মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে।
লিখিত অভিযোগের পরিপেক্ষিতে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ সঠিক সীমানা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়ার এক মাস পরও তা বাস্তবায়ন করেনি ইউএনও। এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের পূর্ব চর পাত্রখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র রাস্তাটি দখল হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলের রাস্তাসহ পাশের খাস জমি বন্দোবস্ত দেখিয়ে দখলে নিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের উপজেলা শাখার সাবেক সহ- সভাপতি আইনুল হক মোল্লা, তার মেয়ে, জামাই জাহাঙ্গীর আলম ও মেয়ে বিউটি বেগম।
অভিযোগ উঠেছে, ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে স্কুলের রাস্তা উদ্ধার না করে ইউএনও প্রভাবিত হয়ে রেজাউল করিমের ব্যক্তি মালিকানা জমির উপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। শুধু তাই নয়, এক প্রকার গায়ের জোরে গত ১৭ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান নির্দেশ দিয়ে জমির তিনটি বড় ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে নেন। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় দেড় লাখ টাকা। এ গাছ কাটায় মানা হয়নি কোনো সরকারি বিধিবিধান।
এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে জমির মালিক রেজাউল করিম কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে ২৪ আগস্ট লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক জমির সীমানা নির্ধারণ ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গত ৩ সেপ্টেম্বর রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি সরেজমিনে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জন্য ইউএনওকে নির্দেশনা দেন। দীর্ঘ এক মাস পেরিয়ে গেলেও ইউএনও মো. মাহমুদুল হাসান এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
স্থানীয় বাসিন্দা মন্ডল মিয়া (৬০), শামসুল হক (৭০), সাহেব উদ্দিন (৬৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দিবালোকের মতো সত্য স্কুলের রাস্তা জবরদখল করে বাড়ির সীমানার ভিতর নিয়েছে আইনুল মোল্লা ও জাহাঙ্গীর। তারা ভুয়া বন্দোবস্ত দেখিয়ে খাস জমি দখল করে আছে। এখন সরকারি খাস জায়গার রাস্তা উদ্ধার না করে ইউএনও রেকর্ডকৃত জমিতে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। গাছ কাটার আগে জমির মালিকের অনুমতি নেননি। এমনকি স্থানীয় অধিবাসীদেরও করা হয়নি জিজ্ঞাসাবাদ। সরকারি খাস জমির রাস্তা উদ্ধার না করে ব্যক্তি মালিকানা জমি জোরপূর্বক দখলের ইউএনওর নির্দেশের বিরোধিতা করেন তারা।
ভুক্তভোগী ও জমির মালিক রেজাউল করিম বলেন, রেকর্ডিয় সূত্রে আমি এই জমির মালিক। খাস জমির স্কুলের রাস্তাটি দখল হয়ে যাওয়ার পর থেকে এটি উদ্ধারে ডিসি অফিস পর্যন্ত চেষ্টা করেছি। দখলদারের ছেলে ইউএনও (মাইদুল ইসলাম ইউএনও দোহা) হওয়ায় প্রশাসনিকভাবে রাস্তা উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো আমার রেকর্ডকৃত জমি দিয়ে জোরপূর্বক রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন ইউএনও। তার নির্দেশে আমার জমির তিনটি বড় ইউক্যালিপটাস গাছ কাটা হয়েছে। এ বিষয়ে ২৫ আগস্ট থানায় অভিযোগ করি।
চিলমারী মডেল থানার সাব ইন্সপেক্টর বাবুল আহমেদ ঘটনা তদন্ত করে সত্যতা পান। সীমানা নিয়ে জটিলতা থাকায় মামলার আগে তিনি আমাকে সীমানা নির্ধারণের পরামর্শ দেন। কিন্তু ইউএনওর পক্ষপাতিত্ব এবং প্রভাব বিস্তারের কারণে সীমানা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। তিনি দুর্নীতিবাজ ইউএনওসহ সংশ্লিষ্টদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
চিলমারী মডেল থানার এসআই ও তদন্ত কর্মকর্তা বাবুল আহমেদ বলেন, সরেজমিনে গিয়েছিলাম। গিয়ে শুনেছি ইউএনও স্যার বলেছেন স্কুলের রাস্তা করা জন্য গাছগুলো কাটার জন্য। বিবাদী দাবি করছেন তাদের সীমানায় গাছ থাকায় কাটা হয়েছে। বাদী রেজাউল করিমকে সীমানা নির্ধারণ করে নিতে বলা হয়েছে। সীমানা নির্ধারণ হওয়ার পর তার পক্ষে হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ফরিশ মিয়া, মিজানুর রহমান, রবিউল ইসলাম বলেন, গাছ কাটার সময় উপস্থিত সবাইকে জানানো হয়েছে, এই গাছ ইউএনওর হুকুমে কাটা হচ্ছে। গত ১৭ আগস্ট গাছ কাটার দিন জমির মালিক রেজাউল করিম চিলমারী থানায় ফোন দিলে এসআই জাহাঙ্গীর আলম ঘটনাস্থলে এসে গাছ কাটতে নিষেধ করেন। পরে তিনিও নিশ্চিত করে উপস্থিত স্থানীয় লোকজনকে বলে গেছেন, এই গাছ ইউএনওর হুমকিকে কাটা হচ্ছে, তাই আমাদের করার কিছু নেই। যা বলার ইউএনও স্যারের সাথে বলুন।
পূর্ব চর পাত্রখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিয়াজ বীন রানু বলেন, আমি এই বিদ্যালয়ে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে যোগদান করি। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১২ জন। বিদ্যালয়ে আসার কোনো রাস্তা নেই। মানুষের বাড়ির ভিতর দিয়ে এবং আবাদি জমি মাড়িয়ে স্কুলে পৌঁছাতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। আর একটু বন্যা হলেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন পার্শ্ববর্তী শামসুল হকের বাসায় অস্থায়ী স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তিনি দাবি করে আরও বলেন, স্কুলে আসার জন্য একটা সুন্দর রাস্তা ছিল ব্রিজের মাথা থেকে স্কুল পর্যন্ত। এই রাস্তায় ২০১৬ সাল থেকে আমি ২০২০ সালে করোনায় স্কুল বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত যাতায়াত করতাম। করোনা শেষে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে স্কুলে এসে হতবাক হই। রাস্তা হাওয়া হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী বাড়ির আইনুল ইসলাম মোল্লা এবং জাহাঙ্গীর স্কুল আসার রাস্তা তাদের বাড়ির ভিতরে ইটের দেয়াল ও টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে নেয়। ফলে স্কুলে যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ ঘটনা নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরে এবং ইউএনও অফিসে অনেকবার আবেদন নিবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। ফলে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সরকারি নম্বরে মেসেজ দেওয়া হলেও রিপ্লাই পাওয়া যায়নি। দুদিন থেকে তিনি ফোন রিসিভ না করায় রোববার সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সরেজমিন গেলে দেখা যায় ইউএনওর চেম্বারে তালা। পরে চিলমারী উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসিম উদ্দিন বলেন, ইউএনও স্যার ঢাকায় মিটিংয়ে গেছেন। মিটিং শেষ হলে তিনি অফিসে আসবেন। আজ শেষ হলে কাল আসবেন।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল বারী সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, দুইটি পরিবার অন্যায়ভাবে সরকারি খাসজমিসহ স্কুলের রাস্তা দখল করে নিয়েছে। ইউএনও সরকারি জমি এবং স্কুলের রাস্তা উদ্ধার না করে উল্টো ব্যক্তি মালিকানা জমির উপর রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। গাছ কাঁটারও অভিযোগ রয়েছে। পূর্ব চর পাত্রখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৮৮ সালে। তখন থেকে ব্রিজের মাথা থেকে একটি রাস্তা স্কুল পর্যন্ত সংযোগ ছিল। ২০০০ সালের দিকে আইনুল ইসলাম মোল্লা এবং তার জামাতা জাহাঙ্গীর সরকারের ১নম্বর খাস খতিয়ানের ৩৬ শতক জমি দখল করে বাড়ি করে। ৪/৫ বছর আগে দখল করতে করতে এক পর্যায়ে স্কুলের রাস্তাও নিজ বাড়ির বাউন্ডারির ভিতরে নিয়ে নেয়। মূলত দখলদার আইনুল মোল্লার ছেলে মাইদুল ইসলাম ঢাকা দোহা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। ফলে ইউএনও মহোদয়ের দুর্বলতা, কলিগের প্রতি। এ কারণে বারবার তাগাদা দেওয়ার দেওয়ার পরও সমস্যা সমাধাণ হয়নি।
এবিষয়ে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান,রেজাউল করিম যে অভিযোগ দিয়েছেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের জন্য ইউএনওকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমি ছুটিতে আছি চিঠির উত্তর দিয়েছে কিনা আপনাকে অফিসে গিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারব। তবুও আমার কর্মকর্তার কাছে খোঁজ নিতে পারেন। ইউএনও ঢাকায় মিটিংয়ে আছে হয়তো সে কারো সে ফোন ধরতে পারছে না।


















