অপরাধচিত্র প্রতিনিধি: খুলনা নগরী ও এর আশপাশের এলাকায় কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া খুন, গুলি বর্ষণ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী হামলার মতো ঘটনায় নগরবাসী আতঙ্কিত। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। অথচ একের পর এক অপরাধের ঘটনায় মূল হোতারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ কিছু ছোট অপরাধীকে ধরে তাদের দায়িত্ব সেরেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকের কারবার দমনে বিশেষ অভিযান শুরু হলেও কার্যত কোনো সুফল মেলেনি। একের পর এক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছেই। নগরীতে সর্বশেষ আলোচিত ঘটনাটি গত রোববার সন্ধ্যায়। নতুন রাস্তার মোড় এলাকায় এনা পরিবহনের কাউন্টারের বাথরুম থেকে গলাকাটা অবস্থায় ইমন নামে এক কলেজছাত্রকে উদ্ধার করা হয়। ইমন সেদিনই প্রথম কাউন্টারে কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। চাকরির প্রথম দিনেই এমন নৃশংসতার শিকার হওয়ার ঘটনায় নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। একই সময়ে কাউন্টারের ক্যাশ বাক্স থেকে টাকা লুটের অভিযোগও উঠেছে। যদিও ঘটনাটি ডাকাতি, পরিকল্পিত হামলা নাকি অন্য কিছু সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। গুরুতর আহত ইমনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর দুদিন আগে, ৩ জুলাই রাতে নগরীর রূপসা নতুন বাজার বেড়িবাঁধ সড়ক এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয় দশম শ্রেণির এক ছাত্রী। সূত্র জানায়, ওই কিশোরী পুলিশের তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসীর বোন। কয়েকদিন আগে প্রেমঘটিত এক ঘটনায় তাকে চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। গত ৪ জুলাই রাতে দিঘলিয়া উপজেলার গাজীরহাট ইউনিয়নের মোল্লাডাঙা এলাকায় যাত্রীবেশী দুর্বৃত্তরা গলা কেটে হত্যা করে ভ্যানচালক সমির ভট্টকে (৪০)। হত্যার পর তার ভ্যানটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে পুলিশের ধারণা। ঘটনাস্থল থেকে কিছুদূরে ভ্যানটি উদ্ধার করা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে গত ২ জুলাই সকালে লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় গুলি করা হয় রাতুল শেখ নামে এক যুবককে। তার আগে ২৮ জুন রাতে গল্লামারী আইডিয়াল নার্সিং হোম ক্লিনিকের সামনে চাঁদা না দেওয়ার জেরে গুলি করা হয় ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম মানিককে। এসব ঘটনায়ও এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
গত পাঁচ বছরে খুলনায় সংঘটিত অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নগরীতে বেড়েই চলছে খুনের ঘটনা। খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) তথ্যমতে, ২০২১ সালে নগরীতে খুন হয় ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, এরপর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খুলনায় ১৯টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফেব্রুয়ারিতে খুলনা শহরে খুন হয়েছে চারটি, মার্চে চারটি, এপ্রিলে দুটি ও মে মাসে পাঁচটি।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগর ও জেলায় এখন ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এগুলো হলো রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ। এর বাইরে দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ এলাকায় ছোট ছোট কিছু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের অধিকাংশই মাদক ও অস্ত্র কারবারকেন্দ্রিক। কিছু গ্রুপ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, জমি, ঘের, ঘাট, পরিবহন বা ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত।
সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নিজেদের শক্তির জানান দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। এমন অন্তত ১৩টি ফেসবুক পেজ ও আইডির খোঁজ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব পেজ থেকে বিভিন্ন জনকে ইঙ্গিত করে খুনের হুমকি ও প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে নানা পোস্ট দেওয়া হয়। সন্ত্রাসী গ্রুপের নামে পোস্টার টাঙিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জড়ো হয়ে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে পোস্ট দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেএমপি সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজি দমনে বিশেষ যৌথ অভিযান জোরদার করলেও বাস্তবচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। জুন মাসজুড়ে চলা এ বিশেষ অভিযানে ৪৫৫ সন্ত্রাসী-মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়। পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার হয় ৪৬২ জন, অন্য মামলার আসামি ২৭৩ জন। অভিযানে মোট গ্রেপ্তার হয় ১ হাজার ১৯০ জন। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসী মাত্র তিনজন। তারা হলেন কসাই লিটন, রিফাত হোসেন ও আজম খান। বাকিদের বড় অংশই মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী কিংবা বিভিন্ন মামলার সাধারণ আসামি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, পুলিশের কাছে সবকিছুর তথ্য থাকলেও আন্তরিকতার ঘাটতি স্পষ্ট, আর ছোটখাটো অপরাধী ধরে বিশেষ অভিযান চালানো অনেকটাই লোকদেখানো কার্যক্রম।
এ বিষয়ে কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, ‘সম্প্রতি খুলনায় আমাদের একটি যৌথ অভিযান শেষ হয়েছে। এ অভিযানের ফলে খুলনার সন্ত্রাসীদের মধ্যে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমাদের অভিযান শেষ হয়ে গেছে এমনটি নয়, যখনই অপরাধীদের তথ্য পাচ্ছি সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করছি।’
গত মাসে চলা যৌথ বাহিনীর অভিযানে কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়নি এবং যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা সবাই ছোটখাটো আসামি—এমন প্রশ্নের জবাবে কেএমপি কমিশনার বলেন, খুলনার দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসীই এখন দেশের বাইরে। একজন মালয়েশিয়ায় অন্যজন ভারতে। তারা তাদের সমস্ত কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালনা করছে। দেশের বাইরে থেকে অর্ডার দিলে এখানে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসী দলের সদস্যরা অপরাধ সংঘটন করছে। তাদের বিষয়েও আমাদের নজরদারি অব্যাহত আছে। পুলিশের সাইবার সেল, ডিবিসহ অন্যান্য গোয়েন্দা বাহিনীও তাদের গতিবিধি নজরদারিতে রেখেছে।


















