Sunday , 5 July 2026 |
  1. অপরাধ
  2. অপরাধচিত্র বিশেষ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. কক্সবাজার
  7. কিশোরগঞ্জ
  8. কুমিল্লা
  9. কুষ্টিয়া
  10. কৃষি ও প্রকৃতি
  11. ক্রীড়াঙ্গন
  12. খুলনা
  13. খেলাধুলা
  14. গাইবান্ধা
  15. গাজীপুর

মুক্তিযুদ্ধে আহত হন মন্নাস আলী, ৫৫ বছর পর পেট থেকে গুলি অপসারণ

প্রতিবেদক
Newsdesk
July 5, 2026 10:16 pm

জাহিদ হাসান, নেত্রকোনা থেকে :
মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে ৫৫ বছর আগে। কিন্তু সেই যুদ্ধের একটি গুলি এতদিন ধরে রয়ে গিয়েছিল একজন মানুষের শরীরে। প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি ব্যথা যেন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যেত ১৯৭১ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনে। অবশেষে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ৭৫ বছর বয়সী মন্নাস আলীর শরীর থেকে বের করা হলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছোড়া সেই গুলি।

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের হরিয়াউন্দ গ্রামের বাসিন্দা মন্নাস আলী। তিনি কোনো ইতিহাসের বইয়ের চরিত্র নন; মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতার এক জীবন্ত সাক্ষী। ১৯৭১ সালের ৬ মে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংস হামলায় প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ানোর সময় একটি গুলি তাঁর পেটে বিদ্ধ হয়। সেই গুলি নিয়েই পার হয়ে যায় জীবনের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পারা, অস্ত্রোপচারের ভয় এবং গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা তাঁকে গুলিসহ বেঁচে থাকতে বাধ্য করে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এক ভয়াবহ প্রতিরোধ থেকে। হরিয়াউন্দ গ্রামে এক নারীকে সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করলে ওই নারী, আরেক নারী এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা মিলে তিনজন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেন। পরদিন প্রতিশোধ নিতে পাকবাহিনী আশপাশের গ্রামগুলোতে হামলা চালায়। একটি ঘরে অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে আগুন দেওয়া হয়, পাশাপাশি নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। সেই হামলায় বহু মানুষ প্রাণ হারান, আর যারা পালিয়ে বাঁচেন, তাঁদেরই একজন ছিলেন মন্নাস আলী।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়োব রচিত ‘নেত্রকোনা জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থেও এই গণহত্যা ও প্রতিশোধমূলক হামলার বর্ণনা রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সেই দিনের ভয়াবহতা আজও এলাকার প্রবীণদের স্মৃতিতে অমলিন।

দীর্ঘদিন ধরে শরীরে গুলি থাকার বিষয়টি শুধু পরিবারের সদস্যরাই জানতেন। সম্প্রতি বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের উদ্যোগে তাঁকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শরীরে গুলি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। শনিবার (৪ জুলাই) আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তানজিরুল ইসলাম রায়হানের নেতৃত্বে প্রায় ৩০ মিনিটের সফল অস্ত্রোপচারে গুলিটি বের করা হয়। পুরো চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে বিনামূল্যে।

মন্নাস আলীর ছেলে আবুল হোসেন বলেন, “বাবা প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারিনি। তিনি নিজেও গুলি বের করতে ভয় পেতেন। আজ সবাই মিলে সহযোগিতা করায় বাবার শরীর থেকে গুলিটি বের হয়েছে।”

পুত্রবধূ হামিদা খাতুনের কণ্ঠেও ছিল স্বস্তি আর আবেগ। তিনি বলেন, “শ্বশুর সব সময় বলতেন তাঁর শরীরে গুলি রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করতাম, কিন্তু নিজের চোখে কখনো দেখিনি। তিনি বলতেন, মারা গেলে যেন গুলি বের না করে দাফন করা হয়। আল্লাহর রহমতে জীবিত অবস্থাতেই গুলিটি বের হলো।”

অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসক ডা. তানজিরুল ইসলাম রায়হান বলেন, “প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে গুলি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সফলভাবে গুলিটি অপসারণ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া গুলির বিষয়ে থানাকে জানানো হয়েছে। রোগী বর্তমানে সুস্থ আছেন এবং কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।”

এই ঘটনা শুধু একটি সফল অস্ত্রোপচার নয়; এটি স্বাধীনতার মূল্য, যুদ্ধের ক্ষত এবং রাষ্ট্রের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাও নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। প্রশ্ন উঠছে—একজন মানুষ কীভাবে ৫৫ বছর ধরে শরীরে যুদ্ধের গুলি নিয়ে বেঁচে থাকলেন? কেন তাঁর চিকিৎসা এতদিন হয়নি? এমন আরও কত অজানা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নীরবে বেঁচে আছে?
মন্নাস আলীর শরীর থেকে বের হওয়া ছোট্ট ধাতব গুলিটি যেন শুধু একটি অস্ত্রের অংশ নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী, যা অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একজন মানুষের শরীরে বহন করেছে স্বাধীনতার নির্মম মূল্য।

সর্বশেষ - অপরাধচিত্র বিশেষ

আপনার জন্য নির্বাচিত
Share via
Copy link