অপরাধচিত্র ডেস্ক: আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন, সেই পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনকালে ও ব্যক্তিগত জীবনেও পুলিশের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে, যা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ২২ জুলাই রাত আনুমানিক ৯টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের সি ব্লকের ৪ নম্বর রোড এলাকায় স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন উপপরিদর্শক (এসআই) ওসমান গনি। এ সময় পেছন থেকে অজ্ঞাত এক দুর্বৃত্ত তাঁর পিঠে ছুরিকাঘাত করে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার পর প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন এসআই ওসমান। পরবর্তীতে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাঁর পিঠে ৪৫টি সেলাই লেগেছে। আহত ওই কর্মকর্তা বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) কর্মরত। ভুক্তভোগী জানান, ঘটনার দিন সকালে কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি পাসপোর্টের বিষয়ে কথা বলার জন্য তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করেছিল। এ হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৬ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এর আগে ও পরে দেশের অন্যান্য স্থানেও পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে: চট্টগ্রামের ঘটনা: গত ২৫ জুলাই রাত ৮টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর আমবাগান এলাকায় মাদক মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে যান ডবলমুরিং থানার এসআই মবিনুল ইসলাম। এ সময় দুর্বৃত্তরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। এতে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পান তিনি।সোনারগাঁ ও অন্যান্য: সোনারগাঁয়ে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয় তিন পুলিশ সদস্যকে। এছাড়া অপর এক ঘটনায় নারী আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে আহত হন আরও ৬ জন পুলিশ সদস্য।আদাবরে ছিনতাইকারীদের হামলা: গত ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে ছিনতাইকারীদের আস্তানায় অভিযানে গেলে তাদের অস্ত্রের আঘাতে জখম হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালালে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়।
পরবর্তীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, “কেউ অস্ত্র দিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করলে অবশ্যই আত্মরক্ষার্থে বলপ্রয়োগ করতে হবে। আমরা চেষ্টা করি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে। কিন্তু যখন অস্ত্র নিয়ে সরাসরি আক্রমণ করা হয়, তখন আত্মরক্ষার্থে বলপ্রয়োগ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।”
পরিসংখ্যানে হামলার চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৩১৭ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।জানুয়ারি: ৪২ জনফেব্রুয়ারি: ৪২ জনমার্চ: ৬৩ জন এপ্রিল: ৬৬ জন মে: ৫৫ জন জুন: ৪৯ জন
অতীতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়—২০১৯ সালে ৫৫৫ জন, ২০২০ সালে ৪৪৯ জন, ২০২১ সালে ৬০৮ জন, ২০২২ সালে ৬০১ জন, ২০২৩ সালে ৬০৭ জন, ২০২৪ সালে ৬৪৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৬০১ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন।
সব মিলিয়ে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন ও অন্যান্য ঘটনায় সর্বমোট ৪ হাজার ৩৮১ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর এ ধরণের ক্রমাগত আক্রমণ সামগ্রিক দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


















