কাওসার চৌধুরী
নিবন্ধটি লিখতে গিয়ে বারবার মনে পড়ছে চলতি বছরের ২৩ জুন ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সারাদেশে সতর্কাবস্থা জারির কথা। নাশকতার শঙ্কায় ওইদিন ছয় জেলায় সেনাবাহিনী, পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েনসহ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছিল সরকার। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত ছিল ১৮ হাজার অতিরিক্ত পুলিশ। ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী’ ঘিরে আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকাতে সারাদেশে তৎপর ছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন (সমকাল, ২৪ জুন, ২০২৬)।
লক্ষণীয়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল আওয়ামী লীগের। সেটা প্রতিহত করার জন্য সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে– এই পর্যন্ত ‘রাজনৈতিক হিসাব’ ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেদিন উল্লিখিত ওই রাজনৈতিক দলগুলোকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সমাবেশ করতে হলো কেন, তাও সাতসকালে! জঙ্গলাকীর্ণ, বিধস্তপ্রায় ‘ইট-সিমেন্টের’ বাড়িটিতে কী এমন অবশিষ্ট আছে, যা এই রাজনৈতিক দলগুলোকে শঙ্কিত করে তুলেছিল!
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে ২০২৫ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি বাড়িটির দুই-তৃতীয়াংশ ভেঙে দেওয়া হয় বুলডোজার এবং এক্সক্যাভেটর দিয়ে। তারও পরে কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাড়িটি একাধিক দফা ভাঙা হয়। ফলে বাড়িটির তেমন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, গোটা দুই-তিনেক দেয়াল ছাড়া।
এই ভাঙাভাঙি এবং আগুন দেওয়ার কাজটি কারা করেছে, কেন করেছে– সে সম্পর্কে দেশবাসী অবগত। ওসব বিস্তারিত লিখে কলেবর না বাড়ালেও চলে। বরং ভগ্নপ্রায় বাড়িটির অন্তর্নিহিত শক্তির দিকেই নজর দেওয়াটা হবে যৌক্তিক।
মজার বিষয়, রাজউকের নথি অনুযায়ী আলোচিত বাড়ির প্লট নম্বর কিন্তু ৬৭৭। ‘৩২’ হলো সড়ক নম্বর। কিন্তু দেশে-বিদেশে বাড়িটিকে সবাই ‘৩২ নম্বর বাড়ি’ হিসেবেই চেনে-জানে। একসময় শ্রমজীবী মানুষের কাছে ওটা ছিল ‘শেখের বাড়ি’; মধ্যবিত্তরা বলত ‘শেখ সাহেবের বাড়ি’। ওটা ছিল আসলে পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের বাড়ি; তাদের স্বপ্ন এবং আস্থার প্রতীক, শেষ আশ্রয়স্থল।
১৯৬১ সালে এই বাড়িতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস শুরু করেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাড়িটি শেখ মুজিবের নামে নথিবদ্ধ হলেও সংসারটি পরিচালনা করতেন তাঁর সহধর্মিণী ফজিলাতুন নেছা মুজিব। কারণ ৫৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে বঙ্গবন্ধু প্রায় ১৩ বছরই কাটিয়েছেন পাকিস্তানিদের কারাগারে। জীবনের বাকি সময়টা তিনি ব্যয় করেছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, পাকিস্তানি শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে লড়াই-সংগ্রামের পেছনে। এত কিছুর মধ্যে ‘সংসার’ করার মতো ফুরসত কোথায়!
দীর্ঘ সময় ধরে ‘পৌনঃপুনিক’ এই কারাভোগ নীতি আদর্শের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আনুগত্য, দাবির প্রশ্নে আপসহীনতা, জাতির লক্ষ্য অর্জনে তাঁর নেতৃত্বের দৃঢ়তাকেই নির্দেশ করে। পূর্ব বাংলার মানুষের আস্থা শেখ মুজিব অর্জন করতে পেরেছিলেন সততা, সাহস ও সক্রিয়তা দিয়ে। ছয় দফা প্রণয়নের পরে পূর্ব বাংলার মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার। সেই স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন এই জনপদের অবিসংবাদিত নেতা, বাংলার মানুষের আপনজন– ‘বঙ্গবন্ধু’। তাঁর বসতবাড়িটিও হয়ে ওঠে বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, নির্ভরতার প্রতীক। ১৯৬১ সালের পরে ধানমন্ডির ৬৭৭ নম্বর প্লটের বাড়িটি কখন কোন ফাঁকে ‘৩২ নম্বর বাড়ি’ হয়ে উঠল, তা খুঁজে বের করা কঠিন।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে সবাই এই বাড়ির দিকেই তাকিয়ে থেকেছে; অপেক্ষা করেছে অঙ্গুলির নির্দেশনার। একাত্তরে অসহযোগ, ৭ মার্চের ভাষণের আগে-পরে স্বাধীনতার প্রত্যয়ে উদ্বেলিত বাঙালি ৩২ নম্বর এই বাড়ি ঘিরেই অবস্থান নেয়। ৩২ নম্বরের সেই বাড়ি হয়ে উঠল বাংলার বাতিঘর। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগে এই বাড়িতেই ‘আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা’ উত্তোলন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় দলের নেতাকর্মীর পরিকল্পনা এবং নির্দেশনা দেন তিনি এখান থেকেই।
পরিতাপের বিষয়, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট এ বাড়িতেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে প্রাণ হারান বিপথগামী কিছু সেনাসদস্যের হাতে। হত্যাকাণ্ডের পরে বাড়িটি সামরিক সরকার অধিগ্রহণ করে। পরে ১৯৮১ সালের ১২ জুন বঙ্গবন্ধুর জীবিত কন্যাদ্বয় বাড়িটি ফিরে পান। ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট এই বাড়িতেই প্রতিষ্ঠা হয় ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’। বাড়িটি হস্তান্তর হয় ‘বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টে’র কাছে। পরবর্তীকালে জাদুঘরটির নতুন নাম হয় ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’। আইনগতভাবে বাড়িটি এখন এই জাদুঘরের মালিকানাধীন।
চব্বিশের ৫ আগস্ট এ বাড়িতে আগুন দেওয়ার পর পুড়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর সকল স্মৃতিচিহ্ন। পুড়ে গেছে আদালতে প্রদর্শিত বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সকল নথিপত্র, দলিলাদি। ২০২৫ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারিতে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে সেই দেয়ালগুলো, যেখানে রক্ষিত ছিল পঁচাত্তরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের রক্তের দাগ, ছিটকে পড়া মগজের টুকরো এবং অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন, আলামত।
৩২ নম্বর আক্রান্ত হওয়ার পর দেশের সংখ্যাগরীষ্ঠ মানুষ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু কারও পক্ষে বাড়িটি রক্ষায় কিংবা আক্রমণ প্রতিরোধে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রথমত আইনি বাধা, দ্বিতীয়ত ‘মব সন্ত্রাস’। ওদিকে ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করে নির্বাহী আদেশে।
বাড়িটি যখন বুলডোজার এবং এক্সক্যাভেটর দিয়ে ভাঙা হচ্ছিল তখন ‘জয় বাংলা’ বলে প্রতিবাদ করার কারণে অনেককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। বিভিন্ন বয়সের নারীরাও মব সন্ত্রাসীদের লাঞ্ছনা থেকে রেহাই পাননি। ২০২৪ সালের ১৫ আগস্টকে সামনে রেখে অত্যন্ত সাহস নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিতে ফুল ও শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন সংস্কৃতিকর্মী রোকেয়া প্রাচী। তাঁকেও লাঞ্ছিত করে মব সন্ত্রাসীরা।
‘আওয়ামী লীগ’ সন্দেহে ৩২ নম্বরের আশপাশের সড়কগুলোতে পর্যন্ত অনেককে মারধর করা হয় নির্মমভাবে। কাউকে কাউকে বিবস্ত্র করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। নির্যাতিতদের একজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এ অবস্থায় কারও পক্ষে আর ‘৩২ নম্বর’ রক্ষায় কিংবা ওখানে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
৩২ নম্বরে দিনের পর দিন মব সন্ত্রাস চলাকালে অন্তর্বর্তী সরকার ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়! অনেক পরে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা একটি বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন– ‘পুলিশ ভয়ে ঘটনাস্থলে যেতে সাহস পায়নি’।
প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে কি সম্পূর্ণভাবে মুছে দেওয়া যাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের উত্থান পর্ব! বুলডোজার দিয়ে বাড়ি ভেঙে দেওয়া যায় বটে, বঙ্গবন্ধুকে কি মুছে ফেলা যাবে মানুষের হৃদয় থেকে? মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সত্যিকার ইতিহাস বাড়ির দেয়ালে নয়, মানুষের হৃদয়ে লেখা।
যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা উচ্চারিত হতে থাকবে। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা। তিনিই জাতিকে আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং বীরত্বের গৌরব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের মানুষের যাপিত জীবনে, রাজনৈতিক ভাষ্যে তিনি থাকবেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটিও বঙ্গবন্ধুর অক্ষয় স্মৃতি নিয়ে টিকে থাকবে। এর স্থায়ীত্ব কেবল ইট-সিমেন্টের গাঁথুনির ওপর নির্ভরশীল নয়। এর শক্তি ওই ভবনের চৌহদ্দি পেরিয়ে বাংলাদেশজুড়ে বিস্তৃত।
লেখক : প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা


















