Thursday , 3 September 2026 |
  1. অপরাধ
  2. অপরাধচিত্র বিশেষ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. কক্সবাজার
  7. কিশোরগঞ্জ
  8. কুড়িগ্রাম
  9. কুমিল্লা
  10. কুষ্টিয়া
  11. কৃষি ও প্রকৃতি
  12. ক্রীড়াঙ্গন
  13. খুলনা
  14. খেলাধুলা
  15. গাইবান্ধা

জাল দলিলে হাতবদল: বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসের আড়ালের গল্প

প্রতিবেদক
Newsdesk
September 3, 2026 1:20 pm

বরিশাল  প্রতিনিধি: পৈতৃক সূত্রে বরিশাল নগরীর ধান গবেষণা এলাকায় সাড়ে ৯ শতাংশ জমি ভোগদখল করে আসছিলেন মৃত কদম আলী কন্ডাক্টরের ছেলে সিরাজুল আলম নয়ন। জমিটির দলিলসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র তার নামে থাকার পরও গত জুলাইয়ে তাকে সেটেলমেন্ট অফিস থেকে জমির কাগজপত্রসহ হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়।

নোটিশ পেয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন সিরাজুল। পরে জানতে পারেন, তার জরিপ কেটে সাড়ে ৯ শতাংশ জমি দুই নারীর নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ ওই দুই নারী তার পরিবারের কোনও ওয়ারিশ নন। এমনকি তাদের তিনি চেনেনও না।

সিরাজুলের ভাষ্য, প্রায় ৫৬ বছর আগে তার বাবা ওই জমি কিনে ভোগদখল করে আসছেন। বাবার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ হিসেবে তিনিও জমিটি ভোগদখল করছেন। দলিল, পর্চাসহ রেকর্ডীয় কাগজপত্র থাকার পরও সেটেলমেন্ট অফিসের কিছু অসাধু ব্যক্তি আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে তার সম্পত্তির জরিপের কাগজে অপরিচিত দুই নারীকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পরে এ নিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।

জরিপের কাগজে ওই দুই নারী হিসেবে বরিশাল সদর উপজেলার চরহোগলা এলাকার পশুরকাঠী গ্রামের মেহেদী হাসানের স্ত্রী শুভ আক্তার এবং সদর উপজেলার চরমোনাই এলাকার রাজারচর গ্রামের মনির হোসেনের স্ত্রী রাহিমার নাম উল্লেখ রয়েছে।

সিরাজুল বলেন, ‘একই এলাকার আরও ২১ জনের পাঁচটি দাগের মোট ৬৩ শতাংশ জমি ওই দুই নারীসহ সাত জনের নামে জরিপে দেওয়া হয়েছে। সাত জনের মধ্যে সেটেলমেন্ট অফিসের দালাল হিসেবে পরিচিত আলমগীর হোসেন, ছেনোয়ারা বেগম, সেলিম ও সোহাগের নামও রয়েছে। অথচ এসব জমি বছরের পর বছর ধরে প্রকৃত মালিকরা ভোগদখল করে আসছেন।’

রেকর্ডীয় জমি অন্যের নামে দিয়ে টাকা নেওয়া হয়
সিরাজুল অভিযোগ করেন, তার জমির জরিপের সঙ্গে বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসের চার্জ অফিসার ফজলে এলাহী, পেশকার মো. রফিক, সার্ভেয়ার মো. ইদ্রিসসহ একটি বড় চক্র জড়িত। এই চক্র বিভিন্ন মানুষের রেকর্ডীয় সম্পত্তি ভুয়া বা অপরিচিত ব্যক্তির নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করে আসছে এবং এ জন্য বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এভাবে জমি অন্যের নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার পর প্রকৃত মালিককে সেটেলমেন্ট অফিসে মামলা করতে হয়। মামলা করতে গেলেও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। এরপর মামলা নিষ্পত্তি করে জমি ফেরত পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়।

সিরাজুলের ভাষ্য, যাদের পেছনে শক্তি থাকে, তারা কোনোভাবে জমি ফেরত পান। আর যাদের সেই শক্তি নেই, শেষ পর্যন্ত তাদের জমি ওই চক্রের লোকজন দখল করে বিক্রি করে ফায়দা লোটেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দলিল থেকে শুরু করে পর্চাও রয়েছে। এরপরও সেটেলমেন্ট অফিসের ওই চক্রটি একটি জমিখেকো চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বছরের পর বছর এ ধরনের কাজ করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হলেও তাঁরা বহাল তবিয়তে থাকেন। চক্রটির কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অবগত এবং তাদের কাছ থেকেও সুবিধা নেওয়া হয় বলে জানতে পেরেছি।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসে আল্লাহর গজব পড়বে। তারা যেভাবে মানুষকে হয়রানি করছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি থেকে শুরু করে যারা এর ভুক্তভোগী, সবার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এখন চিন্তা হচ্ছে, কীভাবে ওই নাম কেটে সেটেলমেন্ট অফিস থেকে বের হয়ে আসবো।’

বাবা-দাদার জমিও অন্যের নামে

একই অভিযোগ করেছেন শামসুল আলম ও হারুনসহ কয়েকজন ভুক্তভোগী। তারা জানান, স্বাধীনতার আগে থেকেই তাদের বাবা-দাদারা সংশ্লিষ্ট জমিগুলো ভোগদখল করে আসছেন। তাদের মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সূত্রে তারা মালিকানা পেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাদের নামে রেকর্ড, পর্চা ও দলিলও হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, এরপরও তাদের জমির বড় একটি অংশ জরিপে অন্যের নামে দেওয়া হয়েছে। যাদের নামে জমি দেওয়া হয়েছে, তারা তাদের কোনও ওয়ারিশ নন। এমনকি তাদের পরিচয়ও তারা জানেন না।

ভুক্তভোগীরা বলেন, জরিপে যাদের নামে জমি দেওয়া হয়েছে, তাদের নামের সঙ্গে যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে কল করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী খোঁজ করেও তাদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি। তাদের ধারণা, জমি দখলের উদ্দেশ্যে সেটেলমেন্ট অফিসের একটি চক্র ওই ব্যক্তিদের ব্যবহার করছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বরিশাল নগরী থেকে সদর উপজেলা এবং জেলার ১০ উপজেলায় রেকর্ডীয় সম্পত্তি অন্যের নামে জরিপে দেওয়ার এমন বহু অভিযোগ রয়েছে। এরপর প্রকৃত মালিকদের মামলা করতে হয় এবং জমি ফেরত পেতে বছরের পর বছর সেটেলমেন্ট অফিসে ঘুরতে হয়। তাদের প্রশ্ন, রেকর্ডীয় সম্পত্তির সব কাগজপত্র সেটেলমেন্ট অফিসে থাকার পরও কেন টাকার বিনিময়ে মানুষকে এভাবে হয়রানি করা হবে?
তারা আরও বলেন, এর আগেও একইভাবে জরিপের নামে যেসব রেকর্ডীয় সম্পত্তি অন্যের নামে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করে বহু মানুষ বছরের পর বছর অফিস ও আদালতে চক্কর কাটছেন। অনেকেই জমির মূল্যের চেয়েও বেশি টাকা মামলা ও দৌড়ঝাঁপে খরচ করেছেন। হয়রানির শিকার হচ্ছেন পদে পদে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের হস্তক্ষেপ চান তারা।

২২ বছর ধরে জমি উদ্ধারের চেষ্টা বৃদ্ধের

একই ধরনের ভুক্তভোগী বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ৭৫ বছর বয়সী আব্দুস সত্তার মিয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০০৪ সালে উপজেলার বাগধা মৌজায় আমার পৈতৃক সম্পত্তির ২৩ শতাংশ জমি জরিপে পাশের জমির মালিকদের নামে দেওয়া হয়। অথচ ওই জমি আমার বাবা-দাদা ভোগদখল করে আসছিলেন। তাদের মৃত্যুর পর আমি ও আমার ভাইবোনেরা জমিটি ভোগদখল করে আসছি।’

আব্দুস সত্তার মিয়ার অভিযোগ, রেকর্ডীয় সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসের একটি চক্র টাকার বিনিময়ে তার জমির বড় একটি অংশ অন্যের জমির সঙ্গে ঢুকিয়ে দেয়। এ নিয়ে ২২ বছর ধরে জমি উদ্ধারের জন্য মামলা চালিয়ে আসছেন তিনি। মামলা থেকে পরিত্রাণ পেতে ঢাকাতেও দৌড়ঝাঁপ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জমি ফেরত পাননি।

তিনি বলেন, ‘জমির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আমি এখন ক্যানসারে আক্রান্ত। এখন মামলা চালাবো, নাকি নিজের সুস্থতার জন্য চিকিৎসা করাবো—সেটাই বুঝতে পারছি না।’

তার দাবি, এ সময়ের মধ্যে তার ১০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। আগৈলঝাড়া থেকে বরিশালে আসা, থাকা-খাওয়ার খরচের পাশাপাশি সেটেলমেন্ট অফিসের লোকজনকে ঘুষ বাবদও টাকা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপরও অবৈধভাবে কেটে নেওয়া তার জমি আজও উদ্ধার করতে পারেননি।
আব্দুস সত্তার মিয়া বলেন, যারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হলে সাধারণ মানুষ এ ধরনের হয়রানি থেকে রেহাই পাবে।

যা বলছেন সার্ভেয়ার

এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সার্ভেয়ার মো. ইদ্রিস বলেন, ‘জরিপে যাদের নামে দেওয়া হয়েছে, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেটেলমেন্ট অফিস থেকে রায় দেওয়ার পর জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

তবে রেকর্ডীয় সম্পত্তি কীভাবে অন্যের নামে জরিপে দেওয়া হলো—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এর কোনও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
তার বিরুদ্ধে রেকর্ডীয় সম্পত্তি নিয়ে মানুষকে হয়রানির এমন বহু অভিযোগ রয়েছে—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তার ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি।

অফিসের কিছু লোক এ ধরনের কাজ করতে পারেন

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা মৃধা মো. মোজাহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে অফিসের কিছু দুষ্টু লোক রয়েছে, যারা এ ধরনের কাজ করতে পারেন। জমির মালিকরা কাগজপত্র দেখিয়ে তাদের রেকর্ডীয় সম্পত্তির প্রমাণ দিতে পারলে মামলা থেকে তাদের পরিত্রাণ দেওয়া হয়।’

এ ধরনের কোনও নজির আছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বরিশালের এক গণমাধ্যমকর্মীর জমিও এভাবে কেটে নেওয়া হয়েছিল। পরে তা তাকে আবার ফেরত দেওয়া হয়েছে।’
জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা স্বীকার করেন, যারা এ ধরনের কাজ করেন, তারা বেশ শক্তিশালী। এ কারণে অনেক সময় জমির কাগজপত্র থাকার পরও প্রকৃত মালিককে জমি ফেরত পেতে আইনের দ্বারস্থ হতে হয়।

তিনি বারবার তার অফিসের “দুষ্টু প্রকৃতির লোকজন” এ ধরনের কাজ করেন বলে উল্লেখ করেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি কোনও উত্তর দেননি।

পরে জরিপে অন্যের নামে জমি দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগকারী সিরাজুল আলমকে তার কাছে পাঠানোর অনুরোধ করেন জোনাল কর্মকর্তা। তবে পরবর্তী সময়ে চার-পাঁচ দিন ঘুরেও তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ সিরাজুলের। একপর্যায়ে দেখা পেলেও সিরাজুলকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তার পরিচয় অগ্রাহ্য করে কক্ষ থেকে চলে যেতে বলা হয় বলে তিনি জানান।

রেকর্ডীয় সম্পত্তি অন্যের নামে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ, প্রকৃত মালিকদের দীর্ঘদিন মামলা ও হয়রানির শিকার হওয়ার দাবি এবং অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—সব মিলিয়ে বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

সর্বশেষ - অপরাধচিত্র বিশেষ

আপনার জন্য নির্বাচিত
Share via
Copy link