অপরাধচিত্র প্রতিনিধি: রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে চট্টগ্রাম গাজীপু একই দিনে প্রায় একই সময়ে রাস্তায় নামল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী কোথাও শতাধিক কোথাও কয়েক ডজন কোথাও ব্যানার হাতে স্লোগান কোথাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ। পুলিশ ছুটে গেছে ঘটনাস্থলে মিছিল ছত্রভঙ্গ করেছে গ্রেপ্তারও করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেছে একটাই মিছিল রাস্তায় নামার আগেই গোয়েন্দারা জানতে পারলেন না কেন
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পরপর এসব ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি মিছিল নয়, একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় সমন্বিতভাবে কর্মসূচি পালনের ঘটনায় বিষয়টি এখন আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি গোয়েন্দা সক্ষমতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশকে আগাম সতর্ক করা হলেও কোথায়, কখন এবং কারা জমায়েত হবে—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য সময়মতো না পাওয়ায় মিছিল শুরুর আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
গুলশানে বড় জমায়েত, আগাম খবর কোথায়?

শুক্রবারের ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে রাজধানীর গুলশানের ঘটনা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, গুলশান থানার ৩ নম্বর রোডের কেএফসি গলি এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিল বের করেন। পুলিশের হিসাবে জমায়েতে অংশ নেন প্রায় ১০০ থেকে ২০০ জন।
পুলিশ বাধা দিলে মিছিলকারীদের একটি অংশ মারমুখী হয়ে ওঠে এবং তিনটি ককটেল ফেলে পালিয়ে যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে ঘটনাস্থল থেকে ককটেল উদ্ধার করে আব্দুর রহিম (৪২) ও আশরাফ ইসলাম নিহাল (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, পুলিশের হিসাবের চেয়ে জমায়েতের আকার ছিল অনেক বড়। সূত্রটির দাবি, শুক্রবারের কর্মসূচিগুলোর মধ্যে গুলশানের জমায়েতই ছিল সবচেয়ে বড়।
আর এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত বড় একটি জমায়েতের বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য ছিল না কেন?
একই সময়ে গাজীপুর-চট্টগ্রামেও মিছিল:

গুলশানের ঘটনার সময়ই গাজীপুর মহানগরের পূবাইল থানাধীন টেকপাড়া, সোবানি রিসোর্টের পেছনের রাস্তায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ২৫ থেকে ৩০ জন নেতাকর্মী ব্যানার নিয়ে মিছিলের চেষ্টা করেন।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোড এলাকায় সাবেক যুব ও ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে পৃথক দুটি ঝটিকা মিছিল বের হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পুলিশ ধাওয়া দিয়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
তিন নগরের এসব ঘটনাকে এখন একই ধারার:
কর্মসূচি হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পুলিশের আগে মিছিল, পরে অভিযান
পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ঝটিকা মিছিলের কৌশল বদলেছে। অল্প সময়ে কর্মীদের নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো করা, দ্রুত মিছিল বের করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়াই তাদের অন্যতম কৌশল।
ফলে পুলিশকে অনেক ক্ষেত্রেই আগে থেকে মিছিল ঠেকানোর পরিবর্তে ঘটনার পর অভিযান চালাতে হচ্ছে।
সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ও ছবি সংগ্রহ করে মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের মতে, আগাম তথ্য পাওয়া গেলে যে ব্যবস্থা কয়েক ঘণ্টা আগে নেওয়া সম্ভব, পরে গিয়ে সেই ব্যবস্থা নেওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন।
এসবি-সহ গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন
শুক্রবারের একাধিক ঘটনার পর পুলিশের অভ্যন্তরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধু পুলিশের নিজস্ব সোর্সের ওপর নির্ভর করে একই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। এজন্য পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মাঠপর্যায়ের তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এমন অভিযোগও উঠেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ থেকে মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর মধ্যবর্তী প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
‘ডিসেম্বর’ ঘিরে বাড়ছে নজরদারি:
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি অংশ আগামী ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নতুন কৌশলে মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে বলে সূত্রের দাবি।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করেও নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে তৎপরতা তৈরি হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো দাবি করছে।
পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত মাধ্যমে পলাতক নেতাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের যোগাযোগের বিষয়টিও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
উচ্চপর্যায়ে গেছে বিশেষ প্রতিবেদন
শুক্রবারের ঘটনাসহ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগাম তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় এখন মূল প্রশ্ন—ঘটনা ঘটার পর গ্রেপ্তার নয়, ঘটনার আগেই কীভাবে কর্মসূচির খবর পাওয়া যাবে।
পুলিশের বক্তব্য:
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স উইংয়ের এআইজি এ. এইচ. এম. শাহাদাত হোসাইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো দলের কার্যক্রম সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কোনো ঘটনায় গোয়েন্দা ঘাটতি থাকলে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
শুক্রবারের ঘটনাগুলো তাই শুধু কয়েকটি ঝটিকা মিছিল কিংবা কয়েকজনের গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়। একই দিনে রাজধানীসহ তিন নগরে আকস্মিক রাজনৈতিক জমায়েত পুলিশের সামনে তুলে দিয়েছে আরও বড় একটি চ্যালেঞ্জ—গোয়েন্দা তথ্য কতটা দ্রুত মাঠে পৌঁছাচ্ছে, আর সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে পুলিশ কতটা আগে প্রস্তুত হতে পারছে।
এখন সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা।

















