অপরাধচিত্র প্রতিনিধি: এক কেজি ইলিশ আমদানিতে মূল দাম মাত্র ২৫২ টাকা। শুল্ক, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করেও আমদানিকারকের ব্যয় দাঁড়ায় আনুমানিক ৫১৪ টাকা। অথচ সীমান্ত পেরিয়ে সেই মাছই দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে।
অভিযোগ আরও গুরুতর—বিদেশ থেকে আসা এই ইলিশের একটি অংশ ক্রেতার কাছে বিক্রি হচ্ছে ‘পদ্মার’, ‘চাঁদপুরের’ কিংবা ‘বরিশালের’ ইলিশের পরিচয়ে। ফলে কম দামে আমদানি করা মাছ বিক্রি করে একদিকে কয়েকগুণ মুনাফা করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত দেশি ইলিশের নাম ব্যবহার করে ক্রেতাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা।
এদিকে মাত্র দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে এসেছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ। বিপুল পরিমাণ এই আমদানিকে ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে—আমদানি করা মাছের প্রকৃত পরিচয় কি বাজারে ঠিকভাবে জানানো হচ্ছে?
দুই মাসে সাড়ে ৩ লাখ কেজি:
কাস্টমস ও ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন-সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ দেশে এসেছে।
এর মধ্যে জুলাই মাসে আমদানি হয়েছে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি। আগস্টেই এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি।
দুই মাসে আমদানি করা এসব ইলিশের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। জুলাইয়ে ঘোষিত আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।
ফেমাস ট্রেডার্স, সততা ফিশ ফিড, শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, স্বর্ণালী ইন্টারন্যাশনাল ও রাব্বি এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এসব মাছ এনেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
৫১৪ টাকার মাছের দাম ১৮০০:
আমদানিকারকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ভারত থেকে এলসির মাধ্যমে প্রতি কেজি ইলিশের মূল মূল্য প্রায় ২৫২ টাকা।
এর সঙ্গে সরকারি শুল্ক প্রায় ১৬২ টাকা এবং ট্রাক ভাড়া, এলসি খরচসহ অন্যান্য ব্যয় কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা যোগ হয়। সব মিলিয়ে আমদানিকারকের ব্যয় দাঁড়ায় আনুমানিক ৫১৪ টাকা।
কিন্তু ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর সময় সেই মাছের দাম বেড়ে যায় কয়েকগুণ। বাজারে একই মাছ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি পর্যন্ত।
অন্যদিকে ১ কেজি ২০০ থেকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশের দাম প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা।
দামের এই বিশাল ব্যবধানই বিদেশি ইলিশের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
আসল রহস্য ‘পরিচয়ে’
বিদেশি ইলিশ নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে বাজারজাতকরণে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, মাছের গায়ে বা বিক্রির সময় স্পষ্ট করে উৎস না জানিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এসব ইলিশকে দেশি মাছ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে পদ্মার ইলিশ, কখনও চাঁদপুর, বরিশাল কিংবা চট্টগ্রামের ইলিশ।
দেখতে প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতার পক্ষে মাছের উৎস বোঝা কঠিন। ফলে বিক্রেতার কথার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।
বেনাপোল বাজারের ক্রেতা মিলন হোসেনের অভিযোগ, দেশি ইলিশ মনে করে মাছ কেনার পর রান্না করে স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য পেয়েছেন। তাঁর দাবি, কেনার সময় মাছটি ভারতীয় না দেশি—তা বোঝার উপায় ছিল না।
আরেক ক্রেতা আব্দুল জব্বার বলেন, বিদেশি ইলিশকে দেশি পরিচয়ে বিক্রি করা হলে সেটি সরাসরি ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা। এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বাজার হারাচ্ছেন দেশি ইলিশ ব্যবসায়ীরা:
বিদেশি ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই আকারের দেশি ইলিশ যেখানে ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা, সেখানে বিদেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়।
ফলে কম দামে বড় মাছ পাওয়ায় অনেক ক্রেতাই বিদেশি ইলিশ কিনছেন।
বেনাপোলের মাছ ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান বলেন, ভারত থেকে বৈধ প্রক্রিয়ায় ইলিশ আমদানি হচ্ছে। আড়ত হয়ে এসব মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে। বিপুল পরিমাণ বিদেশি ইলিশের সরবরাহ দেশি ইলিশের বিক্রিতে প্রভাব ফেলছে বলেও জানান তিনি।
দেশি ইলিশের ব্যবসায়ী উৎস্য মণ্ডল, বাবু, মাহাবুব, মোস্তাফিজুর ও পরিতোষ বিশ্বাসের অভিযোগ, বিদেশি মাছ কম দামে বাজারে আসায় তাদের বিক্রি কমে গেছে।
‘সাদা মাছ’ নামে ঢুকেছিল ইলিশ:
বৈধ আমদানির পাশাপাশি পণ্যের ঘোষণা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ‘সাদা মাছ’ ঘোষণা করে আনা ১২ কার্টনে প্রায় ৩৬০ কেজি ভারতীয় ইলিশ জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
এই ঘটনায় আমদানির ঘোষণাপত্রে পণ্যের যে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে আনা পণ্যের সঙ্গে তার মিল ছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, সীমান্তে পণ্য আমদানির সময় ঘোষণাপত্র ও বাস্তব পণ্যের সামঞ্জস্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আমদানিকারকদের বক্তব্য:
যোগাযোগ করা হলে কয়েকজন আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা এলসির মাধ্যমে বৈধভাবে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করেছেন এবং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক পরিশোধ করেছেন।
তাদের দাবি, আমদানি করা মাছ তারা আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। এরপর খুচরা বাজারে মাছটি কোন নামে বিক্রি হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই।
মিয়ানমারের ইলিশ নিয়েও প্রশ্ন:
শুধু ভারতীয় ইলিশ নয়, মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশ নিয়েও বাজারে নানা আলোচনা রয়েছে। কোনো কোনো ব্যবসায়ী এসব মাছকে স্থানীয়ভাবে ‘রোহিঙ্গা ইলিশ’ নামেও উল্লেখ করেন।
তবে বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আসা ইলিশ ভারতীয়। মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে।
ফলে বাজারে বিক্রি হওয়া প্রতিটি মাছের উৎস নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে সরবরাহ চেইনের তথ্য যাচাই জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নজরদারি শুধু বন্দরে নয়, বাজারেও:
আমদানির সময় মাছ পরীক্ষা করে কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর মাছটি কোন পরিচয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
ভোক্তাদের দাবি, আমদানি করা ইলিশের ক্ষেত্রে উৎস ও পরিচয় স্পষ্ট করা উচিত। একই সঙ্গে বাজারে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিদেশি মাছকে দেশি পরিচয়ে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ একজন ক্রেতা যদি ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে বিদেশি ইলিশ কিনে সেটিকে ৩ হাজার ৩০০ টাকার দেশি ইলিশ মনে করেন, তাহলে ক্ষতিটা শুধু অর্থের নয়—এটি ভোক্তার অধিকার ও বাজারের স্বচ্ছতার প্রশ্নও।
তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা চায় ক্রেতারা:
দেশি ইলিশের নামে বিদেশি মাছ বিক্রির অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।
তাদের মতে, বৈধভাবে বিদেশি ইলিশ আমদানি হলে তাতে আপত্তি নেই। বরং ক্রেতাকে মাছটির প্রকৃত উৎস জানিয়ে বিক্রি করা উচিত। এতে একজন ভোক্তা নিজের সামর্থ্য ও পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
অন্যদিকে বিদেশি ইলিশকে দেশি পরিচয়ে বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ক্রেতা, দেশি ইলিশ ব্যবসায়ী এবং শেষ পর্যন্ত পুরো বাজারব্যবস্থাই।
তাই ইলিশ আমদানির কাগজপত্র থেকে শুরু করে আড়ত, পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত মাছের উৎস ও পরিচয় যাচাইয়ে সমন্বিত নজরদারি এখন সময়ের দাবি।


















