নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঢাকার নবাবগঞ্জে অটোরিকশাচালক মো. রাহুল (১৯) হত্যা ও অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার দীর্ঘ আড়াই বছর পর রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে মো. সবুজ মিয়া (২৮) ও মো. লালন মোল্লা (৪৩) আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মো. সমেজ (৩২), মো. সবুজ মিয়া (২৮), খবির ওরফে গোবিন্দ (২৮), মো. হাবিব ওরফে সজল (৩৬) এবং মো. লালন মোল্লা (৪৩)।
পিবিআই জানায়, নিহত রাহুল নবাবগঞ্জের চক সিংহড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি ভাড়ায় চালানো অটোরিকশাটি স্থানীয় ওমর ফারুকের ওয়ার্কশপে রাখতেন এবং সেখানেই রাতে ঘুমাতেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এক বার্তায় পিবিআই সদর দপ্তর থেকে সাংবাদিকদের বিষয়টি অবগত করে।
২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে বাসা থেকে রাতের খাবার খেয়ে রাহুল ওয়ার্কশপে ঘুমাতে যান।
পরদিন সকালে বাড়িতে না ফেরায় তার বাবা ওয়ার্কশপে গিয়ে তাকে পাননি। সেখানে রাহুলের অটোরিকশাটিও ছিল না। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার দিকে ওয়ার্কশপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে লিয়াকতের ভুট্টা ও ঘাসের জমির আইলের ঝোপ থেকে রাহুলের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় রাহুলের বাবা মো. আবদুর রহমান বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩৯৪, ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। পরে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এসআই মো. আবদুর রহিমকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
পিবিআই জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে মামলার তদন্তে পাওয়া আসামি মো. সমেজকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মো. সবুজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। সবুজ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খবির ওরফে গোবিন্দ, মো. হাবিব ওরফে সজল এবং মো. লালন মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। লালনও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি পর্যালোচনায় জানা যায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা রাহুলের পূর্বপরিচিত ছিলেন। লালন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাহুলসহ অন্য আসামিরা তার কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন এবং একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করতেন।
পিবিআইয়ের দাবি, লালনের ইয়াবা বিক্রির তথ্য রাহুল বিভিন্ন জায়গায় জানিয়ে দিতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকে আসামিরা তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। একই সঙ্গে তার অটোরিকশাটি ছিনিয়ে নিয়ে বিক্রি করার পরিকল্পনাও করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে সবুজের মাধ্যমে রাহুলকে অটোরিকশাসহ একটি খোলা মাঠে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে লালন, সবুজ, সজল, সমেজ ও গোবিন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পিবিআই জানায়, সেখানে প্রথমে রাহুলকে ইয়াবা সেবন করানো হয়। একপর্যায়ে লালন লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে রাহুলের মাথার পেছনে আঘাত করেন। এতে তার মাথা ফেটে রক্ত বের হয়। পরে কানে ও মুখে ব্লেড দিয়ে আঘাত করা হয়। অটোরিকশার ব্যাটারি দিয়েও তার মুখে আঘাত করা হয়। পরে শ্বাসরোধ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
রাহুলের মরদেহ অটোরিকশায় বসিয়ে আসামি সজলের গরুর খামারে নেওয়া হয়। সেখানে মরদেহ দুই দিন রাখা হয়। পরে ৯ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১টার পর মরদেহটি ওমর ফারুকের ওয়ার্কশপের পাশে ফেলে রাখা হয়।
পরে রাহুলের অটোরিকশাটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা আসামিরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার মামলাটি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে তদন্তভার পাওয়ার পর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। নিরলস তদন্তের মাধ্যমে দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি সময়ের পুরনো মামলাটির ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করতে আমরা সক্ষম হয়েছি।


















